বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ।। ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ৮ সফর ১৪৪৮


ছবি-ভিডিও প্রচার করে নারীর সম্মানহানি, ইসলাম কী বলে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক

সোশ্যাল মিডিয়া এখন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়—অনেক সময় এটি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও শত্রুতা চরিতার্থ করার মাধ্যম হয়ে ওঠে। কোনো পুরুষকে সামাজিকভাবে হেয় বা অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে তার স্ত্রী, বোন, মেয়ে কিংবা অন্য কোনো নারী আত্মীয়ের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ, সম্মানহানি এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার এমন চেষ্টা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়। পরিস্থিতির ধরন অনুযায়ী এতে গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মানহানি, গিবত ও অপবাদের মতো একাধিক গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান—এই তিনটি বিষয়কেই অত্যন্ত মর্যাদা ও পবিত্রতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম মানুষের জান, মাল ও সম্মানের পবিত্রতার কথা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মান-সম্মান একে অপরের জন্য ততটাই পবিত্র, যতটা আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর পবিত্র।’ (সহিহ বুখারি: ১০৫; সহিহ মুসলিম: ১৬৭৯)

মানুষকে অপমান, উপহাস ও হেয় করা থেকেও ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না।’ (সুরা হুজরাত: ১১)

অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন নিষিদ্ধ

কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করা, তার গোপন বিষয় অনুসন্ধান করা কিংবা অনুমতি ছাড়া সেগুলো প্রকাশ করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ‘তাজাসসুস’—অর্থাৎ গোপনে কারও বিষয় অনুসন্ধান বা গোয়েন্দাগিরির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: ১২)

অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার প্রতিও ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৯০)

প্রতিহিংসার শিকার করা যাবে না নিরপরাধ নারীকে

কোনো পুরুষের সঙ্গে বিরোধ বা শত্রুতা থাকলেও তার প্রতিশোধ পরিবারের নিরপরাধ নারী সদস্যদের ওপর নেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম: ১৬৪; সুরা ইসরা: ১৫)

অর্থাৎ, একজনের অপরাধ বা কাজের দায় অন্য কারও ওপর চাপানো যাবে না। তাই কারও প্রতি ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা থেকে তার পরিবারের কোনো নারীর সম্মানহানি করা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট জুলুম ও অন্যায়।

অশ্লীলতা ও অপবাদ ছড়ানো থেকে সতর্কতা

কোনো নারীর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সময় তার সম্মানহানি, অপবাদ এবং সমাজে অশ্লীলতা বিস্তারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম অশ্লীলতার প্রচার এবং মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো—উভয় বিষয়েই কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নূর: ১৯)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের তারা যা করেনি, তার দায়ে যারা কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহযাব: ৫৮)

অন্যায়ের প্রচারে অংশ নেওয়ার দায়

কোনো সম্মানহানিকর ছবি বা ভিডিও প্রথম প্রকাশকারীর পাশাপাশি যারা জেনে-শুনে তা শেয়ার কিংবা ভাইরাল করে, তারাও সেই অন্যায়ের অংশীদার। এমন কনটেন্ট যত বেশি ছড়িয়ে পড়ে, তত বেশি মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন হয় এবং এর দায়ও তত বিস্তৃত হতে থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে ছুটো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা ইসরা: ৩৬)

অন্যের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা

ইসলাম মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং কাউকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হে ওইসব লোক, যারা মুখে ঈমান এনেছ, কিন্তু ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলমানদের গিবত করো না এবং তাদের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তার গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেবেন। আর আল্লাহ যার গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেবেন, তাকে তিনি তার নিজের ঘরেও লাঞ্ছিত করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৮০; জামে তিরমিজি: ২০৩২)

কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের নারী সদস্যের ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ভিডিয়ো ছড়িয়ে তাকে অপদস্থ করার চেষ্টা এই হাদিসের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো অন্যের গোপনীয়তা ও সম্মান রক্ষা করা, তা নষ্ট করা নয়।

ভুল হয়ে গেলে যা করবেন

রাগ, প্রতিহিংসা কিংবা আবেগের বশে কেউ যদি এমন অন্যায় করে ফেলেন, তাহলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট পোস্ট, ছবি বা ভিডিয়ো দ্রুত মুছে ফেলতে হবে। এরপর আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। যেহেতু এ ধরনের ঘটনায় বান্দার হক জড়িত থাকতে পারে, তাই আল্লাহর কাছে তাওবার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সম্ভব হলে তার ক্ষতি পূরণেরও চেষ্টা করা জরুরি।

আইনি দিক

শরয়ি নির্দেশনার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রচলিত সাইবার আইনেও কারও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ, প্রচার কিংবা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। এমন ঘটনার শিকার হলে থানায় অথবা পুলিশের সাইবার অপরাধ-সংশ্লিষ্ট ইউনিটে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

ভুক্তভোগী হলে যা করবেন

কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিয়ো এভাবে ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কিত হয়ে নীরব না থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত। যেমন—স্ক্রিনশট, লিংক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে রাখা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিপোর্টিং সুবিধা ব্যবহার করে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তাও নেওয়া উচিত। পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

মোটকথা, কাউকে হেয় বা অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে কোনো নারীর ছবি বা ভিডিয়ো ব্যবহার করা ন্যায়বিচার, গোপনীয়তা ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার ইসলামি শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের সম্মানের মতোই অন্যের সম্মান ও মর্যাদার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অন্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সূত্র: সুরা হুজরাত, সুরা নূর, সুরা ইসরা, সুরা আনআম, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।

এসএইচ/আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ