বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ।। ৫ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮


ঘুমের সময় বালিশের পাশে মোবাইল রাখা কতটা নিরাপদ?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক

রাতে ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ বুলানো, প্রয়োজনীয় বার্তার উত্তর দেওয়া কিংবা পরদিনের জন্য অ্যালার্ম সেট করা অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। এরপর মোবাইল ফোনটি বালিশের পাশে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন অনেকে। কেউ কেউ আবার বিছানার কাছেই ফোন চার্জে দিয়ে রাখেন। কিন্তু ঘুমের সময় মাথার কাছে মোবাইল ফোন রাখা কতটা নিরাপদ? এতে কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, নাকি ঘুমের মানের ওপরই বেশি প্রভাব পড়ে?

মোবাইল ফোন থেকে কী ধরনের বিকিরণ নির্গত হয়?

মোবাইল ফোনে যোগাযোগের জন্য রেডিওফ্রিকোয়েন্সি (আরএফ) তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহৃত হয়। এসব তরঙ্গের মাধ্যমে ফোন মোবাইল নেটওয়ার্ক, ওয়াই-ফাই ও অন্যান্য তারবিহীন প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।

রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ হলো নন-আয়োনাইজিং বিকিরণ। এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো আয়োনাইজিং বিকিরণের তুলনায় এর শক্তি কম। ফলে এটি সরাসরি ডিএনএর রাসায়নিক বন্ধন ভাঙতে পারে না। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের বিকিরণের সংস্পর্শে থাকার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

ফোন থেকে শরীরে কতটা রেডিওফ্রিকোয়েন্সি শক্তি শোষিত হচ্ছে, তা পরিমাপের একটি পদ্ধতি হলো স্পেসিফিক অ্যাবজর্পশন রেট (এসএআর)। বিভিন্ন দেশে নির্ধারিত নিরাপত্তামান অনুসারে মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে ফোনের মডেল, নেটওয়ার্কের অবস্থা ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী বিকিরণের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।

ঘুমের সময় ফোন কাছে রাখলে কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে?

মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত উদ্বেগগুলোর একটি হলো ক্যানসারের ঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) ২০১১ সালে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রকে ‘সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ বা গ্রুপ ২বি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে।

তবে এই শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ এই নয় যে মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিশ্চিতভাবেই ক্যানসার সৃষ্টি করে। বরং মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সম্পর্কের বিষয়ে সীমিত প্রমাণ রয়েছে, যা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও মস্তিষ্কের ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিদ্যমান প্রমাণ থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই যে ঘুমের সময় ফোন মাথার কাছে রাখলেই ক্যানসার হবে।

তাই শুধু বিকিরণের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফোন শরীরের একেবারে কাছে রেখে দীর্ঘ সময় কাটানো এড়িয়ে চলতে চাইলে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

ফোন কীভাবে ঘুমের ক্ষতি করতে পারে?

বিকিরণ নিয়ে উদ্বেগের বাইরে মোবাইল ফোনের আরও কিছু প্রভাব রয়েছে, যেগুলো ঘুমের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাসঙ্গিক।

১. স্ক্রিনের আলো ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে

মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে দৃশ্যমান আলোর একটি অংশ হিসেবে নীল আলো নির্গত হয়। রাতে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ঘুমানোর ঠিক আগে ফোন ব্যবহার করলে মেলাটোনিন নামের হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে। এই হরমোন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা কিংবা বিভিন্ন বার্তা পড়তে গিয়ে ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যেতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত সময় বিছানায় কাটালেও ঘুমের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

২. নোটিফিকেশনের শব্দ ও কম্পনে ঘুম ভাঙতে পারে

ঘুমানোর সময় ফোন ব্যবহার না করলেও নোটিফিকেশন থেকে সমস্যা হতে পারে। বার্তার শব্দ, ভাইব্রেশন কিংবা স্ক্রিন জ্বলে ওঠার কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কখনো এসব কারণে পুরোপুরি ঘুম না ভাঙলেও ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাব পরদিন ক্লান্তি, ঝিমুনি কিংবা কাজে মনোযোগ কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেতে পারে।

৩. ফোন হাতের কাছে থাকলে বারবার দেখার প্রবণতা বাড়ে

বিছানার পাশে ফোন থাকলে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর সেটি হাতে নেওয়া সহজ হয়। তখন সময় দেখার অজুহাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ কিংবা বার্তা দেখতে শুরু করতে পারেন অনেকে। এভাবে অল্প সময়ের জন্য ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় জেগে থাকা সম্ভব। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক রুটিন ব্যাহত হয়।

ঘুমানোর সময় মোবাইল ফোন কোথায় রাখবেন?

ঘুমের সময় ফোন একেবারে দূরে রাখতেই হবে, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। তবে ঘুমের ব্যাঘাত কমাতে এবং ফোন নিরাপদে রাখতে কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে।

বিছানা থেকে কিছুটা দূরে রাখুন: ফোনটি বালিশের নিচে বা মাথার একেবারে পাশে না রেখে পাশের টেবিলে রাখুন। এতে অপ্রয়োজনীয় ফোন ব্যবহার কমানো সহজ হতে পারে। দূরত্ব বাড়ালে ফোনের রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের সংস্পর্শও কমতে পারে।

প্রয়োজনে এয়ারপ্লেন মোড চালু করুন: ঘুমের সময় মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রয়োজন না থাকলে এয়ারপ্লেন মোড চালু করতে পারেন। এতে সাধারণত সেলুলার সংযোগ বন্ধ হয়। তবে ফোনের সেটিংস অনুযায়ী ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ আলাদাভাবে চালু থাকতে পারে। তাই সব তারবিহীন সংযোগ বন্ধ রাখতে চাইলে সেগুলোও পরীক্ষা করুন।

ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমান: ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন। চাইলে বই পড়া, হালকা গান শোনা কিংবা পরদিনের কাজ গুছিয়ে রাখার মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।

ডু নট ডিস্টার্ব মোড ব্যবহার করুন: রাতে অপ্রয়োজনীয় কল, বার্তা ও নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে এই সুবিধা কাজে লাগতে পারে। জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজন থাকলে নির্দিষ্ট নম্বর থেকে কল আসার সুযোগ চালু রাখা যায়।

বিছানায় ফোন চার্জ দেওয়া এড়িয়ে চলুন: ফোন চার্জ দেওয়ার সময় সেটিকে বালিশ, বিছানার চাদর বা কম্বলের নিচে রাখবেন না। অতিরিক্ত তাপ জমে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে ফোন ও চার্জার শক্ত, সমতল এবং ভালো বায়ু চলাচল হয় এমন জায়গায় রাখুন। প্রস্তুতকারকের নির্দেশনাও অনুসরণ করুন।

বিকল্প অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করতে পারেন: সকালে ওঠার জন্য ফোনের ওপর নির্ভরশীল হলে আলাদা অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করতে পারেন। এতে রাতে ফোন বিছানার কাছে রাখার প্রয়োজন কমবে।

আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই জরুরি

বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুযায়ী, শুধু ঘুমানোর সময় মোবাইল ফোন কাছে রাখলেই গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা হবে, এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই। তবে ফোন ব্যবহারের সময়, স্ক্রিনের আলো, নোটিফিকেশন এবং রাত জাগার অভ্যাস ঘুমের মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই আতঙ্কিত হওয়ার বদলে ফোন ব্যবহারে সচেতন হওয়াই ভালো। ঘুমানোর আগে স্ক্রিন থেকে বিরতি নিন, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন এবং ফোনটি বালিশের নিচে না রেখে নিরাপদ জায়গায় রাখুন।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ