নিজস্ব প্রতিবেদক
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পরিচালিত অভিযানের পেছনে নাস্তিকদের প্রভাব ছিল বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। একটি ইসলামি গোষ্ঠীকে নির্মূলের উদ্দেশে সংঘটিত ‘পরিকল্পিত জেনোসাইড (গণহত্যা) বলেও দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার (২৭ জুলাই) ট্রাইব্যুনাল-২ শাপলা চত্বরের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেওয়ার পর প্রসিকিউশন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় মামলার বাদী ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে তৎকালীন সরকার, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সমন্বয়ে একটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। তবে সে সময় এ ঘটনায় কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি এবং হেফাজতের পক্ষ থেকে বহু চেষ্টা করা হলেও বিচার পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হলে মামলার বাদী লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এরপর তদন্তকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, তৎকালীন সরকার কিছু ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট ও বামপন্থী মতাদর্শের ব্যক্তিদের প্রভাবে হেফাজতে ইসলামকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ওই অভিযান পরিচালনা করে। তার ভাষায়, এটি ছিল একটি ইসলামি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত পরিকল্পিত আক্রমণ।
নিহতের সংখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্তে মোট ৬১ জন নিহতের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অভিযোগপত্রে মূলত দুটি ঘটনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—শাপলা চত্বরে মধ্যরাতের অভিযানে ৩২ জন এবং পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(সি) ধারা অনুযায়ী এসব ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তে ৪১ জনের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কেউ পরিকল্পনায়, কেউ ষড়যন্ত্রে এবং কেউ অভিযানে সরাসরি অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ঘটনার রাতে ইসলামিক টিভি ও দিগন্ত টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দেন, যাতে ঘটনার ভিডিও ও তথ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা না যায়। এছাড়া তথ্য বিকৃতির অভিযোগে একাত্তর টেলিভিশনের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি পুলিশের বিপিএম পদক সংক্রান্ত নথি এবং সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকের প্রকাশিত বই থেকেও প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যা তদন্তে প্রমাণ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, সাবেক বিজিবি প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও সাবেক এনটিএমসি প্রধান জিয়াউল আহসানের নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় অভিযান এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার (ব্ল্যাকআউট) কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল।
পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর জানান, মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে স্পিডি ট্রায়ালের আবেদন করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে এবং তার বিষয়ে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের আওতায় আনা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দলটির ভূমিকা নিয়ে পৃথক তদন্ত চলছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই মামলায় কেবল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তি এবং অভিযানে নেতৃত্বদানকারীদের আসামি করা হয়েছে। কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির ভিত্তিতেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে; সাধারণ পুলিশ সদস্য বা কনস্টেবলদের এ মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আইও/