বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ ।। ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ২৫ জিলহজ ১৪৪৭


বিশ্বকাপ উন্মাদনা: আবেগের উল্লাসে আদর্শের বিসর্জন

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| ওলিউল্লাহ মুহাম্মাদ ||

প্রতি চার বছর পর পর বাংলাদেশের আকাশে এক অদ্ভুত জোয়ার আসে। না, সেটা কোনো বন্যার জল নয়, ঋতু পরিবর্তনের হাওয়াও নয়। সেটি আসলে এক মনস্তাত্ত্বিক ঢেউ—যা মুহূর্তের মধ্যে ছোট্ট এই দেশটাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। একপাশে আকাশী-সাদা, অন্যপাশে ক্যানারি হলুদ। বহুতল ভবনের ছাদ থেকে টিনের চালা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরি থেকে মাটির দাওয়া—সর্বत्र উড়তে থাকে ভিনদেশী পতাকা। ফুটবল বিশ্ব থেকে ভৌগোলিকভাবে হাজার মাইল দূরে থাকা এক দেশের বুকে যেন সগৌরবে বাজে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের জাতীয় সংগীত!

কিন্তু এই উন্মাদনার নিচেই লুকিয়ে আছে এক গভীর, শীতল সত্য—যা নিয়ে আমরা সচরাচর কথা বলি না।

মেসে বা ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকা সেই তরুণটির কথা ভাবুন। মাস শেষে যার পকেটে দুই পয়সা থাকে না, ভবিষ্যৎ যার কুয়াশায় ঢাকা এবং পরিবারের প্রত্যাশার ভার পাথরের মতো বুকে চেপে বসে আছে। এই তরুণ যখন ধারকর্জ করে ব্রাজিলের একটা জার্সি কেনে, তখন সে আসলে কেবল এক টুকরো কাপড় কেনে না; সে কেনে ৯০ মিনিটের একটি কৃত্রিম পরিচয়, এক পলায়নবাদী ছাড়পত্র। মেসির ড্রিবলিং দেখতে দেখতে সে ভুলে যায় নিজের চাকরির অনিশ্চয়তা; নেইমারের পাসের মুগ্ধতায় হারিয়ে যায় তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতার বেদনা। এটি মূলত এক অবদমিত জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক টিকে থাকার কৌশল—নিজের জীবনে সাফল্য না থাকায় সে অন্যের জয়ের ভাগীদার হতে চায়।

বাঙালির প্রাত্যহিক জীবন কাটছে অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক টানাপোড়েন আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায়। মানুষের মনস্তত্ত্ব স্বভাবতই এমন এক আনন্দের দিকে যুগে পড়ে, যা সহজলভ্য, তাৎক্ষণিক এবং samajikbhabe ভাগ করে নেওয়া যায়। ফুটবল ঠিক এই শূন্যতাটুকুই পূরণ করে। এতে অংশ নিতে কোনো পুঁজি লাগে না, এর উত্তেজনা চোখের পলকে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি দলগত পরিচয় এখানে অনায়াসে গায়ে চাপানো যায়। ফলে অলির গলি বিভক্ত হয়ে পড়ে স্থানীয় আনুগত্যে। চায়ের দোকানের শান্ত বাতাস ভারী হয়ে ওঠে তীব্র বিতর্কে, যা অনেক সময় নিরীহ তর্কাতর্কির গণ্ডি পেরিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। অথচ যাদের নিয়ে এই উন্মাদনা, সেই দূর দেশের মানুষগুলো হয়তো মানচিত্রে এই দেশটির অবস্থানও জানে না।

বিশ্ব বিনোদন শিল্প মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে অত্যন্ত সুচতুরভাবে কাজে লাগায়। পুঁজিবাদ প্রথমে মানুষের জীবনকে বিষাদময় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তোলে, আর পরে সেই বিষাদের সাময়িক উপশম বিক্রি করেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা ফাঁদে। বিশ্বকাপের মৌসুমে মিডিয়া, টেলিকম কোম্পানি আর বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো এই আবেগকে পুঁজি করে এক বিপজ্জনক খেলায় নামে। ইন্টারনেট ডেটা প্যাক থেকে শুরু করে কিস্তিতে টেলিভিশন কেনা—সবকিছু এমনভাবে বিপণন করা হয়, যেন মনে হয় এই উন্মাদনায় শামিল না হলে জীবনই বৃথা! কর্পোরেট ব্যবস্থা কখনোই চায় না এই মোহভঙ্গ হোক, কারণ আবেগতাড়িত ও দিশেহারা মানুষই পুঁজিবাদী বাজারের সবচেয়ে খাঁটি ভোক্তা।

কিন্তু এই কৃত্রিম স্বস্তির আড়ালে যে কী ভয়ানক আত্মিক দেউলিয়াত্ব লুকিয়ে আছে, তা একটু গভীরভাবে ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। একজন মুমিন, যার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর দরবারে হিসাবের দাঁড়িপাল্লায় মাপা হবে, সে কীভাবে স্রেফ গোল দেওয়া-নেওয়ার একটি খেলায় মেতে নিজের মহামূল্যবান সময় ও পরকালকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলতে পারে? যে সময়টুকু হতে পারত আল্লাহর জিকিরে, তাওবা-ইস্তিগফারে কিংবা কল্যাণকর জ্ঞানার্জনে, তা আজ অপব্যয় হচ্ছে টিভির পর্দার সামনে চিৎকার-চেঁচামেচিতে।

আরও বেদনার বিষয় হলো, এ দেশের অসংখ্য মুসলিম যুবক অবলীলায় এমন সব দেশ ও খেলোয়াড়দের অন্ধ সমর্থনে মেতে উঠছে, যাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং জীবনধারা ইসলামের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল-কুরআন যেখানে স্পষ্টভাবে আমাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র আদর্শ ধরে রাখার নির্দেশ দেয়, সেখানে একজন সচেতন মুসলিম কীভাবে অনৈসলামিক আদর্শের ধারক দেশগুলোর পতাকাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারে? এই অন্ধ ভালোবাসা আমাদের ঈমানী চেতনাকে ভেতর থেকে ফাঁপা ও পঙ্গু করে দিচ্ছে।

উন্মাদনার এই অন্ধকার পথ এখানেই থেমে থাকে না; এটি সমাজকে ঠেলে দেয় আরও বড় অপরাধের দিকে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অলিতে-গলিতে, চায়ের দোকানে এবং অনলাইনে চলে জুয়া ও বাজি ধরার মহোৎসব। ম্যাচ জিতলে টাকা, হারলে সর্বনাশ—এই জুয়াখেলা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও শয়তানের কর্ম হিসেবে ঘোষিত হলেও, উত্তেজনার বশে লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রতিনিয়ত এই পাপে নিমজ্জিত হচ্ছে। একই সাথে চলছে অর্থের নির্মম অপচয়। যে দেশে কত মানুষ দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম করছে, সেখানে স্রেফ কয়েকদিনের উন্মাদনার জন্য বিশাল পতাকা বানানো আর জার্সি কেনার পেছনে কোটি কোটি টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে। কুরআন আমাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে— "অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।" অথচ আমরা সেই অপচয়কেই উৎসবের রঙে সাজাচ্ছি।

আর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে তখন, যখন পছন্দের দল হেরে যাওয়ার প্রচণ্ড শোকে কোনো কোনো তরুণ আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেয়। এছাড়া পতাকা ওড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বেশ কয়েকজন তরুণের মৃত্যুর সংবাদও আমাদের দেখতে হয়েছে। যে জীবন মহান আল্লাহ তায়ালা এক পরম আমানত হিসেবে দিয়েছেন, যা দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাত জয় করার কথা ছিল—সেই মহামূল্যবান জীবন স্রেফ একটি চামড়ার বলের হার-জিতের বেদনায় মানুষ শেষ করে দিচ্ছে! এর চেয়ে বড় মানসিক দাসত্ব এবং বুদ্ধি-বিবেকের পরাজয় আর কী হতে পারে?

তবে কোনো তরুণকে কেবল 'নাজায়েজ' বা 'সময় নষ্ট' বলে এই অন্ধ পথ থেকে ফেরানো সম্ভব নয়। কারণ এই উন্মাদনা আসলে তার ভেতরের একটি বিশাল মানসিক শূন্যতাকে সাময়িকভাবে পূর্ণ করছে। ইসলাম মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাকে কেবল নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে সমাধান করে না; বরং যে কাঠামো এই সমস্যার জন্ম দিচ্ছে, তা উপড়ে ফেলে একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প দেয়। ইবাদতের প্রকৃত স্বাদ যে একবার পায়, তার কাছে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা ম্লান হয়ে আসে। তাহাজ্জুদের জায়নামাজে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর যে স্বর্গীয় প্রশান্তি, তার সামনে বিশ্বকাপের জয়-পরাজয় একেবারেই তুচ্ছ ও অর্থহীন।

ব্যক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোতেও পরিবর্তন অপরিহার্য। ইসলামের যাকাত, ওশর এবং সুদমুক্ত অর্থনৈতিক নীতি সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে। যখন মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা থাকে, তখন অবদমিত মানসিক চাপ কমে যায় এবং মানুষ 'মানসিক পলায়ন' হিসেবে ফুটবল উন্মাদনায় অন্ধভাবে আশ্রয় খোঁজে না।

মসজিদকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চা, সুস্থ বিনোদন এবং সামাজিক উদ্যোক্তার সংস্কৃতি যদি তরুণদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তবে তাদের এই বিপুল শক্তি ও আবেগ ভিনদেশী পতাকার পেছনে না ছুটে খুঁজে নেবে নিজেদের জীবনের আসল অর্থ। যে তরুণটি নিজে একটি সামাজিক উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তার আর কোনো বিদেশী ফুটবল তারকার ছায়ায় নিজের অস্তিত্ব খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না।

প্রতি চার বছর পর পর আমাদের আকাশে যে লক্ষ লক্ষ ভিনদেশী পতাকা ওড়ে, সেগুলো আসলে কোনো ফুটবলপ্রেমের সুনির্মল নিদর্শন নয়—সেগুলো আমাদের সামাজিক দেউলিয়াত্ব এবং যুবসমাজের মানসিক নিঃসঙ্গতার একেকটি প্রতীকী আর্তনাদ। এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধির নিরাময় কেবল ফতোয়ার শুষ্ক শব্দে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রকৃত সমাধান রয়েছে তরুণদের সামনে একটি অর্থবহ, মর্যাদাপূর্ণ ও কল্যাণকর বাস্তব জীবন উপহার দেওয়ার মাঝে।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও প্রবন্ধকার

আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ