শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ।। ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :

কাশ্মীরের মসজিদে অভিন্ন জুমার খুতবার প্রস্তাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতশাসিত কাশ্মীরের মসজিদগুলোতে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ড। এ উদ্যোগ ঘিরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিসরে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডের প্রধান দারাক্ষান আন্দ্রাবি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গত সপ্তাহের শেষ দিকে বোর্ডের পক্ষ থেকে এ বিতর্কিত উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর কাশ্মীরের শীর্ষস্থানীয় মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতেরা প্রস্তাবটিকে ‘কাশ্মীরি মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ’ বলে নিন্দা জানান। খবর আল জাজিরার।

অভিন্ন খুতবা চালুর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আন্দ্রাবি ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেন, এ উদ্দেশ্যে বোর্ডের অধীনে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিন্ন খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব থাকবে ওই কমিটির হাতে। মাদকাসক্তিসহ অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক অনাচার মোকাবিলায় এ উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আন্দ্রাবির দাবি, জুমার খুতবা অনুমোদনের দায়িত্বে থাকবেন ধর্মীয় পণ্ডিতেরা। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের কোনো কর্মকর্তার ভূমিকা থাকবে না।

তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রোববার কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় পণ্ডিত ও খতিবকে নিয়ে সভা করে ওয়াক্ফ বোর্ড। সভায় কেউ সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, আবার প্রত্যন্ত এলাকার অনেকে ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেন।

শ্রীনগর থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরের পার্বত্য জেলা রাজৌরির এক ধর্মীয় পণ্ডিত অনলাইনে সভায় অংশ নেন। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আন্দ্রাবি জানিয়েছেন, জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় পণ্ডিতদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির আগাম অনুমোদন নেওয়া খুতবাই প্রতি শুক্রবার মসজিদের মিম্বরে পাঠ করতে হবে। তবে ওই কমিটিতে কারা থাকবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ধর্মীয় পণ্ডিত বলেন, ‘আমরা আপত্তি জানিয়ে বলেছিলাম, খুতবায় ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি কিছু থাকলে আমরা এ নির্দেশনা মানব না। কিন্তু তিনি আমাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করেন এবং কথা বলতে দেননি।’

কর্তৃপক্ষের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই পণ্ডিত আরও জানান, আন্দ্রাবি বলেছেন, এ বিষয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কারণ, পরিকল্পনাটি নিয়ে চার বছর ধরে কাজ চলছে।

ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশের দাবির মুখে থাকা কাশ্মীর দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। কাশ্মীরিরা কোন দেশের সঙ্গে থাকতে চান, তা নির্ধারণে গণভোটের দাবিতে বছরের পর বছর আন্দোলন করেছেন। ১৯৮৯ সালে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের পর ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়।

২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে অঞ্চলটিকে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় আনে। একই সঙ্গে তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ—দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এর আগে অঞ্চলটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে পরিচালিত হতো।

২০২৪ সালে সেখানে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা সীমিত। নয়াদিল্লি-নিযুক্ত প্রশাসকের হাতেও গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। এর আগে বিশেষ মর্যাদার আওতায় কাশ্মীরিদের জমি ও আবাসসংক্রান্ত বিশেষ অধিকার সুরক্ষিত ছিল এবং নিজস্ব আইন প্রণয়নের সুযোগও ছিল।

২০১৯ সালের সিদ্ধান্তের আরেকটি প্রভাব পড়ে ওয়াক্ফ সম্পত্তি পরিচালনার ব্যবস্থায়। মুসলমানদের বৃহত্তর সামষ্টিক কল্যাণে উৎসর্গ করা এসব ধর্মীয় দাতব্য সম্পত্তি পরিচালনায় স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত আইন কার্যকর করা হয়।

এমন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে মসজিদগুলোতে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব কাশ্মীরের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় বিষয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ