|| আবদুল্লাহ আফফান ||
পূর্ব প্রকাশের পর থেকে....
|| ৬ষ্ঠ পর্ব ||
যেভাবে সিনিয়র নায়েবে আমির হন তিনি
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে মাওলানা ইসমাঈল নূরপুরী এবং মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. একসঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৮ সালে দলটির তৎকালীন আমির প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান রহ. ইন্তেকাল করলে মাওলানা ইসমাঈল নূরপুরীকে ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই সময় মাওলানা মাহফুজুল হক মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন।
এরপর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বৈঠকে নির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সভাপতির পদের জন্য মাওলানা ইসমাঈল নূরপুরীর নাম প্রস্তাব করা হয়। তখন শূরার অধিকাংশ সদস্য সেই প্রস্তাবের ওপর পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান এবং দলের সিংহভাগ সদস্যের জোরালো মত ছিলÑমাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারীকে আমিরে মজলিস নির্বাচিত করা হোক।
আমিরের পদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত হবে-এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে একপর্যায়ে কিছুটা মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। এই জটিল সমস্যার একটি সম্মানজনক ও সুচারু সমাধানের জন্য পূর্ববর্তী সেশনের আমির, ৬ জন নায়েবে আমির এবং মহাসচিব-সবাই মিলে বসে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নেন, যা সবার জন্য চূড়ান্ত ও অবধারিত বলে বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল।
সেই বিশেষ বৈঠকেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনছারী রহ.-এর নাম উঠে আসে এবং অনেকেই তাঁকে আমির হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু দলের ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে তিনি চরম ত্যাগ ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। অত্যন্ত বিনম্র কণ্ঠে তিনি বলেন-‘আমি আরও পরে এই দায়িত্বে আসি। মাওলানা ইসমাঈল নূরপুরী বয়সে আমার বড়; সুতরাং বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে এই পদটি তাঁকেই দেওয়া হোক। আমি বেঁচে থাকলে এই দায়িত্ব নিতে পারবো।’
তখন দলের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন- ‘আপনার মুখ থেকেই যদি এই সিদ্ধান্ত আসে, তবে এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আপনাকেই দিতে হবে।’
এরপর আনছারী রহ. নিজেই মাওলানা ইসমাঈল নূরপুরীর নাম আমির হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর এই মহানুভবতা ও উদার মানসিকতা দেখে মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে যায় এবং উপস্থিত সব নেতাকর্মী ও শূরা সদস্য তাঁর এই ঘোষণা একবাক্যে মেনে নেন।
এর মধ্য দিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে একটি সুন্দর সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়; মাওলানা ইসমাঈল নূরপুরী দলের আমির এবং মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. দলটির নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দীনি প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও এর প্রতি দরদ
মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে দীনি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নিজ হাতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের ‘জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা’, নাসিরনগরের ‘মিসবাহুল উলুম শঙ্করাদহ মাদরাসা’ এবং হবিগঞ্জের মাধবপুরের ‘দারুল উলুম তেমুনিয়া মাদরাসা’।
এ ছাড়া তিনি আলিয়ারা গ্রামে একটি সুদৃশ্য ও সুবিশাল মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদটি নির্মাণের পেছনে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর গভীর দরদ কাজ করে। আলিয়ারা গ্রামে আগে মাত্র একটি মসজিদ থাকায় দূরবর্তী পাড়ার মানুষের জন্য নিয়মিত জামাতে অংশ নেওয়া বেশ কষ্টকর হতো। বিশেষ করে বর্ষার দিনে দূরে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করা গ্রামবাসীর জন্য দুরূহ ছিল। এলাকার মানুষের সুবিধার কথা চিন্তা করে তিনি তাঁর মায়ের দান করা ২৮ থেকে ৩০ শতক জমির ওপর একটি সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করেন।
সে সময় মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. এক সফরে আমেরিকা অবস্থান করছিলেন। সেখানে কিছু মাহফিলে বয়ান করার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেন। পরীক্ষার একপর্যায়ে চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত অপারেশন করানোর পরামর্শ দেন। সেই অপারেশনের জন্য তখন প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিক সহযোগিতায় সহজেই সেই অর্থের ব্যবস্থা হয়ে যায়। এই অর্থ যোগানোর ক্ষেত্রে ডাক্তার হুমায়ূন কবিরের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জটিল চিকিৎসার সেই মুহূর্তে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও তিনি সবসময় মাদরাসা এবং শিক্ষকদের বেতনের চিন্তায় ব্যাকুল ছিলেন। প্রবাসীদের সহযোগিতার একটি অংশ তিনি মাদরাসার জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। আনছারী রহ. তখন বেড়তলা মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আমানুল হক কাসেমীকে ফোন করে জানতে চান-মাদরাসার উস্তাদদের বকেয়া বেতনের পরিমাণ কত? বিস্তারিত শোনার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দেন- ‘আমি বারো লাখ টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
এর থেকে মাদরাসার উস্তাদদের সমস্ত বকেয়া বেতন পরিশোধ করবে, মিসবাহুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসার মসজিদের ছাদ ঢালাইয়ের কাজে চার লাখ টাকা দেবে এবং বাকি এক থেকে দেড় লাখ টাকা আমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিও।’
এমএম/