|| ওলিউল্লাহ মুহাম্মাদ ||
ঈদুল ফিতর—আনন্দ, মিলন ও স্বস্তির এক অনন্য উপলক্ষ। কিন্তু এই আনন্দ কওমী মাদ্রাসার বহু ছাত্রের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ঈদের ছুটি শেষ হতেই তাদের সামনে হাজির হয় এক নতুন অনিশ্চয়তার অধ্যায়—ভর্তি সংগ্রাম।
অজস্র স্বপ্ন বুকে নিয়ে গ্রামের সরল-নির্মল ছাত্ররা ছুটে আসে রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, একটি ভালো মাদ্রাসায় ভর্তির আশায়। কিন্তু এই স্বপ্নের পথ মোটেও সহজ নয়; বরং এটি এক কঠিন বাস্তবতার পরীক্ষাক্ষেত্র।
প্রথমবার শহরে আসা এসব ছাত্রদের কাছে ঢাকা যেন এক বিশাল অচেনা জগৎ। গ্রামের শান্ত পরিবেশ থেকে হঠাৎ করেই তারা পড়ে শহরের কোলাহল, যানজট ও ব্যস্ততার ভিড়ে। কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে—এসব অনিশ্চয়তায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। পথঘাটের অজ্ঞতার কারণে এক মাদ্রাসা থেকে আরেক মাদ্রাসায় যাওয়াও হয়ে ওঠে কষ্টকর ও ক্লান্তিকর।
ভর্তির প্রক্রিয়াটিও সহজ নয়। ভালো মাদ্রাসাগুলোতে ইন্টারভিউ ছাড়া সুযোগ মেলে না। সেখানে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে কেউ আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিতে পারে, আবার কেউ ভয়ে থেমে যায়। একাধিকবার ব্যর্থ হলে হতাশা গ্রাস করে তাদের মন। ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তার দোলাচলে কাটে প্রতিটি দিন—“আমি কি পারব?”, “আমার জন্য কি কোনো জায়গা আছে?”—এমন দুশ্চিন্তা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
তার ওপর রয়েছে সময়ের সীমাবদ্ধতা। সাধারণত এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। অথচ একই দিনে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ইন্টারভিউ অনুষ্ঠিত হওয়ায় ছাত্রদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দৌড়ে গিয়েও অনেক সময় সব পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় থাকা-খাওয়ার সংকট। যাদের আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত কেউ আছে, তারা কিছুটা স্বস্তি পায়। কিন্তু যাদের কেউ নেই, তাদের অবস্থা আরও করুণ। কেউ বন্ধুর কক্ষে অস্থায়ী আশ্রয় নেয়, কেউ মসজিদের বারান্দায় রাত কাটায়। অনেকেই খরচ বাঁচাতে একবেলা খেয়ে দিন পার করে। সীমিত অর্থ নিয়ে শহরে এসে এই অনিশ্চিত জীবনযাপন তাদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
তথ্যের অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক ছাত্র জানেই না কোথায়, কবে পরীক্ষা হবে। ভুল তথ্যের কারণে তারা এক মাদ্রাসা থেকে আরেকটিতে ছুটে বেড়ায়, গিয়ে দেখে তারিখ পরিবর্তিত হয়েছে। এতে সময় ও অর্থ—উভয়ই অপচয় হয়, আর বাড়ে হতাশা।
শহরের ব্যস্ততার ভিড়ে নতুন এসব ছাত্রদের দিকে অনেকেই তেমন নজর দেয় না। সিনিয়র ছাত্ররা নিজেরাই ভর্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নতুনদের সাহায্য করার সুযোগ কমে যায়। কিছু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সহযোগিতার হাত বাড়ালেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় উদাসীনতা। ফলে নতুনরা নিজেদের একা ও অসহায় মনে করে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—সীমিত আসনের কারণে অনেক যোগ্য ছাত্রও ভর্তি হতে পারে না। একবার সুযোগ হাতছাড়া হলে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ ছোট মাদ্রাসায় ভর্তি হয়, কেউ অপেক্ষায় থাকে, আবার কেউ হতাশ হয়ে গ্রামে ফিরে যায়। এতে অনেক স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।
এই বাস্তবতায় কিছু গঠনমূলক উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বড় মাদ্রাসাগুলোর উচিত ভর্তির সময়সীমা বৃদ্ধি করা, যেন ছাত্ররা স্বাচ্ছন্দ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। একই দিনে একাধিক ইন্টারভিউয়ের চাপ কমাতে সমন্বিত সময়সূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে আসা ছাত্রদের জন্য অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করা জরুরি। নামমাত্র খরচে হলেও খাবারের ব্যবস্থা থাকলে তাদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়। ভর্তি ফরমের মূল্য সহনীয় রাখা, অযৌক্তিক দেরি পরিহার করা এবং তথ্যপ্রবাহ সঠিক রাখা—এসব বিষয়েও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
পুরনো ছাত্রদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের উচিত নতুনদের দিকনির্দেশনা দেওয়া, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ আন্তরিকতা ও মানবিক আচরণই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা তৈরি করে। ভর্তি না হলেও একটি ভালো অভিজ্ঞতা একজন ছাত্রের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
৭ শাওয়ালকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই ‘ভর্তিযুদ্ধ’ বহু তালিবুল ইলমের ঘুম কেড়ে নেয়, তাদের ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দেয়। তবুও তারা হাল ছাড়ে না—নিরলস চেষ্টা করে, স্বপ্ন দেখে, এগিয়ে চলে। কেউ সফল হয়, কেউ ব্যর্থতার বেদনা নিয়ে ফিরে যায়।
তবে এই পথকে যদি একটু সহজ, একটু মানবিক করা যায়—তাহলেই হাজারো স্বপ্ন আরও সুন্দরভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে।
সকল ভর্তিচ্ছু তালিবুল ইলমদের জন্য রইলো আন্তরিক দোয়া ও শুভকামনা—তারা যেন তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়। আর সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান—একটু সহানুভূতি, একটু সহযোগিতাই পারে এই সংগ্রামকে অনেকটাই সহজ করে দিতে।
লেখক, শিক্ষক, গবেষক ও প্রবন্ধকার
এমএম/