বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


কওমি সিলেবাস সংস্কার: প্রস্তাবনামূলক কিছু কথা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: ফাইল ছবি

|| মাওলানা আবু সাঈদ ||

কোনো জিনিসের নির্মাণ, সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয় তার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। উদ্দেশ্যটি যেন সহজলভ্য হয়, বেশি পরিমাণে অর্জিত হয় এবং সময় ও যুগোপযোগী হয়। কওমি মাদরাসার উদ্দেশ্য কী, সেটি জানার ওপর নির্ভর করে কওমি সিলেবাসের সংস্কারটা কেমন হবে এবং কী পরিমাণের হবে। কওমি মাদরাসা তার উদ্দেশ্যে হিসেবে বেছে নিয়েছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীসের ভাষ্যকে, যে হাদীসটি ইমাম বায়হাকী রহ. তাঁর আল মাদখাল কিতাবে বর্ণনা করেছেন। মেশকাত শরীফেও উল্লেখ আছে হাদীসটি। তা হল,

عن إبراهيم ابن عبد الرحمان العذري قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم، يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله، ينفون عنه تحريف الغالين وانتحال المبطلين وتأويل الجاهلين. رواه البيهقي في المدخل إلى السنن الكبرى-

‘হযরত ইবরাহীম ইবনে আবদুর রহমান আল উযরি বর্ণনা করে বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক পরবর্তী প্রজন্ম থেকে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরাই এই ইলম ধারন করবে। তারা এ থেকে দূর করবে অতিরঞ্জনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থিদের মিথ্যার সংযোজন, অজ্ঞদের ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।’ (বায়হাকী)

ইলমে দ্বীন তথা কুরআন—সুন্নাহর ইলম এর সুরক্ষা ও সংরক্ষণ সম্পর্কে বর্ণিত বিখ্যাত এই হাদীসটিতে যে عدول শ্রেণিটির কথা বলা হয়েছে, কওমি মাদরাসা বা দরসে নেজামীর মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর শীর্ষ উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই শ্রেণিটি ˆতরি করা। যাদের প্রধান কাজ হবে বাড়াবাড়ি দূরীকরণ, জালিয়াতি রোধ ও অপব্যাখ্যার জবাব দেওয়ার মাধ্যমে ইলমে দীনের সুরক্ষা বিধান। অর্থাৎ তারা পাহারাদারি করবে দ্বীনি ইলমের। এই পাহারাদারি ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। ওলামায়ে উম্মতের উপর জিম্মাদারি। অনাদায়ে রয়েছে জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ।

দ্বিতীয় প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, উম্মাহর তাফাক্কুহ ফিদ দ্বীনের ফরযে কেফায়া আদায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ জনগণের ধর্মীয় জিম্মাদারি ও অভিভাবকত্ব পালন। সরকারের আর্থিক ও ˆনতিক সমর্থন থাকলে যেমন একাজগুলো ওলামায়ে উম্মাহর কর্তব্য, না থাকলেও কর্তব্য থেকে পলায়নের সুযোগ নেই। ক্ষেত্রবিশেষ দ্বীনি জিম্মাদারি পালন করতে হয় বিনিময় চুক্তির উর্ধ্বে ওঠে। কাজের বিপরীতে দুনিয়াবি কিছু প্রাপ্তির আশা থাকলেই করব, অন্যথায় নয়, এমন সুযোগ থাকে না। দ্বীনি কাজ ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর মতই। নিজের খেয়ে নিজের পরে কাজ করে যেতে হয় দ্বীনের। এক্ষেত্রে সরকার বা সাধারণ মুসলিম কর্মবণ্টনের আলোকে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করলে অবশ্য কাজটি সহজ ও অনায়াসসাধ্য হয়।

তো বোঝা গেল, কওমি মাদরাসা একটি বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য দ্বীনি ইলমের সংরক্ষণ ও দ্বীনকে বিকৃতি থেকে বাঁচানোর জন্য কুরআন হাদীসের বিজ্ঞ আলেম তৈরি করা। এই উদ্দেশ্য অর্জনে বর্তমান সিলেবাস কতটুকু উপযুক্ত, সেই আলোচনা অবশ্যই হতে পারে। উপযুক্ততা-অনুপযুক্ততার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজনও হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন আর বাস্তবতা সামনে রেখেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। তবে কওমি মাদরাসা থেকে কেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বের হচ্ছে না, কেন বিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছে না, এমন প্রশ্ন অবান্তর। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে কেউ যেমন ডাক্তার আশা করে না, মেডিকেল কলেজ থেকে যেমন ইঞ্জিয়ার বের হয় না, কওমি মাদরাসার বিষয়টিও সেভাবেই ভাবতে হবে।

সংস্কার হতে পারে, বিকৃতি নয়:

মানবসৃষ্ট কোনাকিছুই সংস্কারের ঊর্ধ্বে না। কওমি মাদরাসায় সমস্যা আছে অনেক। অনেককিছুই সংস্কার প্রয়োজন। এটা সত্য। তবে সংস্কারের ফলে যেন বর্তমানের চেয়ে অবনমন না হয় সেটা লক্ষণীয়। মাদরাসা শিক্ষা সংস্কারের অর্থ মাদরাসাগুলোকে সরকারিকরণ নয়। সরকারি সিস্টেমের ভিতরে ঢুকে গেলেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে; বিষয়টি এমনও নয়। স্কুল কিংবা আলিয়া; যাদের অনুকরণে কওমিকে সরকারি করা হবে, তাদের পরিণতি কি খুব সুখকর? তারাও তো হাজারও সমস্যায় জর্জরিত। দ্বীনদারি এবং দ্বীনি শিক্ষার অবস্থা যেমন তাদের তলানিতে, চাকরির বাজারেও তো আগুন। বেকারত্ব চরম পর্যায়ে। শিক্ষিত বেকারে ভরপুর দেশ। হতাশায় অনেকে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছে। তাদেরই যখন হাজারে দশ জনের চাকরি মিলছে, আমাদের কি হাজারে নয়শো জনের চাকরি হয়ে যাবে? তাহলে যে বেকারত্ব থেকে মুক্তির জন্য সরকারের কাছে ধরা দেওয়া বা যে কর্মসংস্থানের আশায় অধীনতা মেনে নেওয়া, সেই সমস্যা তো থেকেই যাচ্ছে| মধ্যখান দিয়ে দ্বীনি শিক্ষা ও স্বকীয়তা পড়বে হুমকির মুখে।

আলিয়া মাদরাসাগুলোতে চাকরিরত শিক্ষক-কর্মচারী যাদের মধ্যে একটু ইলম-কালামের আগ্রহ আছে; তারাও নিজ সন্তানদের আজকাল কওমিতে পড়াচ্ছেন। আবার কোনো কোনো আলিয়াতেও আজকাল সম্পূরক ব্যবস্থা হিসেবে সংযুক্ত করা হচ্ছে কওমি ধারা। আলিয়ায় ইলম, আমল ও দ্বীনি যোগ্যতার ঘাটতির কারণ হিসেবে কওমির কর্মপন্থার অনুপস্থিতিকে চিহ্নিত করছেন। অতএব স্বকীয় ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনায় কওমি মাদরাসাগুলো এখনো পর্যন্ত যেভাবে চলছে, মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য হাসিলে সেটিই সবচে নিরাপদ। মনে রাখতে হবে, নারীকে নারী রেখে উন্নয়ন আর নারীকে পুরুষের মত বানিয়ে উন্নয়ন যেমন এক নয়, তেমনি মাদরাসাকে মাদরাসার বৈশিষ্ট্যের উপর রেখে উন্নয়ন আর মাদরাসাকে স্কুল কলেজের মত বানিয়ে উন্নয়ন এক নয়। একটা প্রশংসনীয়। আরেকটা নিন্দনীয়।

সেক্যুলার রাষ্ট্রে একমুখী শিক্ষার ধারণা:

অনেকেই একমুখী শিক্ষার কথা বলেন। তাদের দাবি, ‘বৃটিশ শাসনের আগ পর্যন্ত দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী শিক্ষা ছিল না। পরাধীন ভারতে ইসলাম ধর্ম, ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষার্থে পৃথক ব্যবস্থাপনায় মাদরাসা শিক্ষা চালু হয়েছে। আমার মনে হয়, তাদের চিন্তায় সামান্য ফাঁক থেকে যাচ্ছে। তা হল, দেখুন, কোনো দেশের সরকারই চায় না, দেশে দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী শিক্ষাধারা চালু থাকুক। সকল সরকারই চায়, দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা একটি মূলধারায় প্রবাহিত হোক।

ভারতীয় উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে যে ত্রিমুখী শিক্ষা চালু আছে; এর দায় সরকারের নয়। আমাদের পূর্বসূরী বিচক্ষণ ওলামায়ে কেরামের কেবল দাবিই নয়, রীতিমত আন্দোলনের ফসল এই পৃথক শিক্ষাব্যবস্থা। ওলামায়ে কেরামের জোরালো দাবির প্রেক্ষিতেই পৃথক ধারায় ধর্মীয় শিক্ষা চলছে। আমরা সবাই মিলে আজকে যদি একমুখী শিক্ষার দাবি জানাই, সরকার সাথে সাথে লাব্বাইক বলবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি সরকার এমনটি করার জন্যই বিভিন্ন ফন্দি আঁটছে দীর্ঘদিন যাবৎ।

কথা হলো, আমরা কেন এই পৃথক ধারা এখনো চালু রাখার পক্ষে? এর কারণ, বৃটিশদের শাসন থেকে এদেশ মুক্ত হলেও ‘বৃটিশ পদ্ধতির শাসন’ থেকে আমরা এখনো মুক্ত হতে পারিনি। আজও যারা এই দেশগুলোতে শাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন; তারা সবাই বৃটিশদেরই মানস সন্তান। বৃটিশদের শাসন নীতিতেই রাষ্ট্র শাসন করছেন তারা। তাই বৃটিশদের শাসনাধীন ভারতে ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি যে ঝুঁকিতে ছিল, এখনও সেই ঝুঁকিতেই রয়ে গেছে। আলিয়া শিক্ষাধারা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এমতাবস্থায় একমুখী শিক্ষার দাবি আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়| ভারতবর্ষ থেকে বৃটিশরা চলে গেলেও যেহেতু এ অঞ্চলে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি, খলীফাতুল্লাহগণ যেহেতু দেশগুলো শাসন করছেন না; তাই, ধর্ম ও ধর্মীয় শিক্ষা-সংস্কৃতির সুরক্ষার জিম্মাদারিও বর্তমান শাসক দ্বারা পালন সম্ভব নয়। স্বায়ত্ত শাসন বা নিজ জিম্মায়ই এখনও আমাদের ধর্ম-কর্মের সুরক্ষা বিধান করতে হবে|

মাওলানা তাকি উসামানী হাফি. তাঁর এক বক্তব্যে বলেন, “পাক ভারত উপমহাদেশ থেকে ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানে তো জামিয়া কারাউয়্যীনের পথ অনুসরণ করার দরকার ছিল। কিন্তু সরকার যেহেতু তা করেনি এবং ধর্মীয় জ্ঞানের সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থাও নেয়নি, তাই ওলামায়ে কেরাম বাধ্য হয়ে দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষাব্যবস্থার অনুসরণে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেন কমপক্ষে নবুবি ইলমের তথা ধর্মীয় জ্ঞানের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। আলহামদুলিল্লাহ! উলামায়ে কেরাম প্রতিকূল পরিবেশে ব্যক্তি উদ্যোগে দ্বীনি ইলম সংরক্ষণে যে ত্যাগ-তিতিক্ষা শিকার করেছেন এবং বড়-বড় খেদমত সম্পাদন করেছেন, ইতিহাসে তা বিরল। দ্বীনি ইলমের সংরক্ষণে পৃথিবীর আর কোনো দেশের ওলামায়ে কেরাম ব্যাপকভাবে এমন ত্যাগ শিকার করেছেন কী না, তা আমাদের জানা নেই। যাইহোক যতদিন পর্যন্ত আমাদের দেশের শাসকশ্রেণি ও সমাজব্যবস্থা পরিপূর্ণরূপে ইসলামী ধাঁচে গড়ে না উঠবে এবং ইসলামী সরকার জামিয়া কারাউয়্যীনের মতো দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু না করবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা এ (কওমি/দেওবন্দি) মাদরাসাসমূহকে যথারীতি সংরক্ষণ করব এবং আকাবিরে দেওবন্দ যেভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন আমরা যথাসম্ভব সেভাবে এগুলোকে বহাল রাখব। এগুলোর উপর কাউকে হস্তক্ষেপ করতে দেব না। কেননা মুসলমানদের দ্বীনের সুরক্ষা এ মাদরাসাসমূহের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তদুপরি আমাদের দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা যদি ইসলামী হয়েও যায়, তবুও দ্বীনি শিক্ষার বিশেষজ্ঞ আলেম তৈরির অঙ্গন হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো বহাল থাকবে।” [কমাশিসা, লক্ষ্যপানে এগিয়ে চলি]

হ্যাঁ, বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে একমুখী শিক্ষা ছিল এদেশে। কারণ তখন ছিল ইসলামী শাসন। শাসকই ছিলেন ধর্ম, ধর্মীয় শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক। ধর্মীয় শিক্ষা রাষ্ট্রীয়ভাবে বিবেচিত হত সবচে মূল্যবান শিক্ষা হিসেবে| রাষ্ট্রের বড় বড় পদে নিয়োগদান করা হত ধর্মীয় শিক্ষার যোগ্যতার ভিত্তিতে। সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে যা আজ অবর্তমান। মূল্যায়নের সংস্কৃতিও এখন উল্টো। এসব দেশে ধর্ম থেকে যে যত বিচ্ছিন্ন, তার মূল্যায়ন তত বেশি। যে যত ধার্মিক, রাষ্ট্র তাকে মনে করে তত আনফিট। মূল্যায়নের এই সংস্কৃতির কারণেই আলিয়া মাদরাসাগুলোতে আলিম পড়ার পর বেশিরভাগ ছাত্র চেষ্টা করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স করতে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়লে কেউ ইসলামী কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনাও করতে চায় না। একমুখী শিক্ষার নামে কওমিকে যদি বিবদমান মূলধারার শিক্ষার সাথে একীভূত করা হয়, তাহলে ‘তাফাক্কুহ ফিদদ্বীন’ এর ফরজে কেফায়া আদায়ের লোক থাকবে না। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিগুলোতেও ধর্ম শিক্ষা আছে, ইসালামিক স্টাডিজ আছে। আলিয়া তো মাদরাসা হিসেবেই পরিচিত। সেখানকার ধর্মীয় শিক্ষার হালচালের প্রতি সামান্য নজর বুলালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে আশা করি|

কওমি শিক্ষা ও সরকারি চাকরি:

কওমি মাদরাসায় পড়ে সরকারী চাকরিতে যোগদান করতে না পারার বিষয়টিকেও অনেকে সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের সাথে আমি সবিনয় দ্বিমত পোষণ করি। বড়ো আশ্চর্য লাগে, বিশুদ্ধভাবে নামাজ পড়া-পড়ানো, দ্বীনের ইলমকে তাহকীকের সাথে অর্জন, সুরক্ষা ও সংরক্ষণ, উম্মাহর তাফাক্কুহ ফিদ্দীন এর ফরজে কেফায়া পালন, নতুন প্রজন্মকে সঠিক দ্বীনি তালীম প্রদান, এগুলোকে আজকাল কেউ কাজই মনে করছেন না। এমনকি মাদরাসার আলেম, তালিবে ইলমগণও না সবাই শুধু বলছে, কওমি মাদরাসা শিক্ষা বা দাওরার মাস্টার্স স্বীকৃতি কোনো কাজেরই না। মানে সরকারি চাকরিই যেন একমাত্র কাজ সবার দৃষ্টিতে। বাজারদর না থাকায় নিজের দ্বীনি খেদমতগুলোকে এমন তুচ্ছ জ্ঞান করা নিঃসন্দেহে হীনম্মন্যতা। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।

দেখুন, বাংলাদেশে তিনটি শিক্ষাধারা চালু আছে। কওমি, আলিয়া, স্কুল। এই তিন ধারার দুটিই সরকারি। সেসব প্রতিষ্ঠানে পড়ে সরকারি চাকরিতে যাওয়ার সুযোগ আছে। সরকারি চাকরিটাই যেসব অভিভাবকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তারা চাইলেই কিন্তু খুবই স্বল্প খরচে নিজ বাড়ির পাশের স্কুল কিংবা আলিয়া মাদরাসায় পড়িয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু তা না করে যেসব পরিবার সরকারি চাকরির সুবিধাহীন কওমি মাদরাসায় সন্তানকে পড়ান, তারা মূলত ভিন্ন একটি চাহিদা থেকে পড়ান। কওমি মাদরাসায় মানুষ তাদের সন্তানদের পড়ান ইলম এবং আমলের জন্য। আদর্শ মানুষ বানানোর জন্য। সরকারি চাকরির জন্য নয়। যদি তাই হত, তাহলে স্কুল ও আলিয়া থাকতে সন্তানকে কওমিতে নিয়ে আসবে কেন। এজন্য দেখবেন, স্কুল কলেজে দ্বীনদারির ঝুঁকি যত বাড়ছে, কওমি মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার্থীর ভীড় তত বাড়ছে। আর একজন দ্বীনদার মুসলিমের কাছে ইলম ও আমলের প্রয়োজন সরকারি চাকরির চেয়ে হাজার গুণ বেশি। অতএব সরকারি সুযোগ-সুবিধা জারির কারণে কিংবা কওমিকে সরকারিকরণের কারণে যদি সেই ইলম আর আমলই ব্যাহত হয়, তাহলে মানুষ তার সন্তানকে কওমিতে পড়াবে কোন দুঃখে?

দুটি প্রশ্ন ও এর জবাব:

এখানে দুটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্নদুটি হল,

১| কওমির ফারেগরা কি তাহলে জাগতিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে? তাদের কর্মক্ষেত্র কি মসজিদ মাদরাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে?

২| জাতি কি কওমির এসব সৎ, যোগ্য ও মেধাবী তরুণদের সেবা থেকে বঞ্চিত থাকবে?
জবাবে বলব, এটা তো স্বীকৃত ব্যাপার যে, কওমিতে পড়ে বৈধ যেকোনো পেশা গ্রহণের সুযোগ আছে| বর্তমান বিশ্বে একাডেমিক সার্টিফিকেটের চেয়ে দক্ষতার মূল্য বেশি। কওমিতে পড়াশোনা করার পর কোনো একটি বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়ন করতে পারলে মসজিদ মাদরাসার বাইরেও রয়েছে কওমি ফারেগদের জন্য কর্মের বিরাট ময়দান। এক্ষেত্রে চিন্তার উদারতাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কওমিতে পড়াশোনা করলে শুধু মসজিদ মাদরাসাতেই খেদমত করতে হবে, এমন চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বৈধ যেকোনো পেশায় যাওয়ার বা গ্রহণের উদার মানসিকতা লালন করতে হবে।

এছাড়া প্রত্যেকটি জেলায় দু’একটি সমন্বিত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান যদি বেফাক বোর্ডের তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যেমন আমাদের কিছু ফারেগ যাওয়ার সুযোগ পাবে। কওমির সৎ মেধাবীদের সেবা দ্বারা লাভবান হতে পারবে রাষ্ট্র ও সরকার। কওমি সিলেবাসও তার স্বকীয়তা নিয়ে বহাল থাকবে।

স্বীকৃতি ও সনদের মূল্যায়ন যেভাবে হতে পারে: 

বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই কওমি সিলেবাসের সর্বোচ্চ শ্রেণি তাকমীলকে মাস্টার্সের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কৌশলে এই স্বীকৃতি কাজে লাগাতে পারলে সিলেবাসের স্বকীয়তা বজায় রেখেও কওমির ফারেগদের কর্মক্ষেত্র বাড়তে পারে। দাওরায়ে হাদীসের স্বীকৃতি ও সনদের কার্যকরিতার জন্য সবচে নিরাপদ উপায় হচ্ছে, একটি স্বায়ত্বশাসিত স্বতন্ত্র কওমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। যার অধীনে বিবদমান কওমি সিলেবাসকে এসএসসি, ইন্টারমিডিয়েট, অনার্স-মাস্টার্স স্তরে ভাগ করে স্বীকৃতি কার্যকরের ব্যবস্থা করা হবে। ইসলামিক স্টাডিজ হিসেবে কওমি শিক্ষার্থীদের অনার্স-মাস্টার্স এবং এমফিল-পিএইচডি হবে কওমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ধর্মীয় সকল অঙ্গনে সরকারিভাবে সেই সার্টিফিকেটকে ধরা হবে ইসলামিক স্টাডিজ এর সমমান।

কওমি পড়ুয়া যারা ইসলামিক স্টাডিজ এর বাইরে অন্যান্য বিষয় নিয়ে পড়তে চায় বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগ্রহ রাখে, তাদের সেই চাহিদা পূরণের বিকল্প ব্যবস্থা এমন হতে পারে যে, দাওরা পর্যন্ত সিলেবাসের সময়কাল কিছুটা কমিয়ে দাওরার পর কোনো একটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষা বা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে অন্যান্য বিষয়ে বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিফট হওয়ার ব্যবস্থা রাখা। কওমি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামিক স্টাডিজের উপর পৃথক বিসিএস আয়োজনেরও দাবি করা যেতে পারে, যেমনিভাবে ডাক্তারদের জন্য স্পেশাল বিসিএসের ব্যবস্থা আছে।

স্বীকৃতি কাজে লাগানোর লক্ষ্যে কাফিয়াকে এসএসসি, শরহে বেকায়াকে এইচএসসি সমমানের ধরে অন্যান্য শিক্ষাবোর্ডের সাথে সমন্বয় করে দেওয়ার চেষ্টা কওমি শিক্ষার জন্য আত্মঘাতী এবং অত্যন্ত হঠকারী সিদ্ধান্ত হবে। এমনটি করলে দুটি পরিণতি থেকে কওমি

অঙ্গন কিছুতেই বাঁচতে পারবে না :

১| শরহে বেকায়ার পর কওমি সিলেবাসে পড়াশোনা করার জন্য শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না। কওমির উচ্চতর পড়াশোনায় ছাত্র সংকট দেখা দিবে তীব্রভাবে।

২| অদূর ভবিষ্যতে ‘তাফাক্কুহ ফিদদ্বীন’ এর ফরজে কেফায়া আদায়ের লোক থাকবে না। পার্শপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ সরকারি ব্যবস্থার বাইরে চালু হবে বিকল্প আরেকটি কওমি ধারা।

কওমি সিলেবাসকে আরও বেশি কার্যকর ও সময়োপযোগী করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

১| উপরে বর্ণিত উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখে পাঠ্য সিলেবাস সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা।

২| অবকাঠামো ও পরিচালনা বিষয়ে সংস্কার আনা।

৩| দাওরার পর ডিপ্লোমা পদ্ধতিতে দক্ষতা ভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষা সংযুক্ত করা।

৪| মানহীন প্রতিষ্ঠান, মানহীন পাঠদান নিয়ন্ত্রণ করা।

৫| উচ্চতর শিক্ষাকে আরও পরিমার্জিত ও বিধিযুক্ত করা।

৬| শিক্ষকতা পেশাকে বাধ্যতামূলক শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা নিবন্ধন পরীক্ষা টাইপের কিছু দিয়ে আরও বিধিবদ্ধ করা।

৭| একই প্রতিষ্ঠানে ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ফযীলত, তাকমীল একসাথে না রেখে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষাস্তর অনুসারে ভাগ করা। ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, জামিয়া তথা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রত্যেক স্তরের শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য পৃথক পৃথক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এতে নির্দিষ্ট স্তরের শিক্ষার মানের প্রতি মনোযোগ বেশি দেওয়া সম্ভব হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে

৮| কওমি পড়াশোনায় ব্যয় হ্রাস করার ব্যাপারে চিন্তা করা জরুরি। যদিও বিষয়টি একটু কঠিন। তবে এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কারণ, শিক্ষাকে সুলভ করা না গেলে তা ব্যাপকতা লাভ করে না। কওমি মাদরাসার শিক্ষা ব্যয় দিন দিন বেড়েই চলেছে। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের জন্য সন্তানকে কওমি মাদরাসায় পড়ানো এখন রীতিমত কঠিন ব্যাপার। একাধিক সন্তানকে ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে আবাসিক রেখে পড়ানো তো প্রায় অসম্ভব। অথচ দীনি শিক্ষা—যা একই সাথে দ্বীনি দাওয়াতও বটে, হিসেবে সর্বনিম্ন খরচে তা অর্জনের সুযোগ রাখার প্রয়োজন আগেও যেমন ছিল, এখনও আছে। কওমি পড়াশোনায় ব্যয়ের সবচে বড় খাত প্রত্যেক বছর মোটা অংকের টাকায় ভর্তি, কিতাবাদি ক্রয় ও খোরাকি। মাদরাসায় বাচ্চাকে পড়াতে বেশিরভাগ অভিভাবককে প্রাথমিক স্তর থেকেই আবাসিকে রেখে পড়াতে হয়। অথচ স্কুল বা আলিয়ায় ইন্টারমিডিয়েট বা আলিম পর্যন্ত নিজ বাড়িতে থেকেই অনায়াসে পড়াশোনা করতে পারে শিক্ষার্থীরা। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার জন্য বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে থাকতে হয়। কওমি মাদরাসার শিক্ষাও যদি মানুষের নাগালের ভিতরে রাখা যায়, অর্থাৎ প্রত্যেক গ্রামে একটি ইবতেদায়ি মাদরাসা, প্রত্যেক ইউনিয়নে একটি বা দুটি সানুভিয়া মাদরাসা যদি নিশ্চিত করা যায়, যেন একজন শিক্ষার্থী বাসায় পরিবারের সাথে খাবার খেয়ে শরহে বেকায়া পর্যন্ত পড়াশোনা করে ফেলতে পারে এবং থাকা-খাওয়ার বড় খরচটি যদি শরহে বেকায়ার আগে না লাগে, তাহলে মাদরাসা শিক্ষা আরও ব্যাপকতা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা পড়ার সময়গুলোতে এমনকি রাতেও মাদরাসাতেই থাকবে। তবে খাবার বাসায় খাবে। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষাস্তর অনুসারে ভাগ করা হবে। শহরের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল উচ্চতর ও বিশেষায়িত (তাখাসসুস) শিক্ষা নিয়ে কাজ করবে এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ছাত্র না টানবে।  

৯| বেফাকভুক্ত সকল প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন সময়সীমা নির্ধারণ ও শ্রেণিগুলোর অভিন্ন নাম চালু করা। একেক জায়গায় একেক নামে শ্রেণির পরিচয় বিভ্রান্তিকর|

১০| আরবি ও বাংলা সাহিত্যের কিতাবগুলো প্রতিবছর না হোক অন্তত দু’বছর অন্তরান্তর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংযোজন-বিয়োজনের পর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করা। দেশের আলোচিত বিষয় ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো আরবি ও বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তকে নিয়ে আসা।

১১| বিদেশে ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে অধ্যয়নের দ্বার উন্মুক্ত করা। আল আযহার, মদীনা ইউনিভার্সিটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিখ্যাত ইসলামিক ইউনিভার্সিটিগুলোর সাথে সরাসরি বোর্ডের উদ্যোগে মুআদালা (Equivalence) চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া।

১২| মহিলা মাদরাসাগুলোতে হুবহু পুরুষদের সিলেবাস চাপিয়ে না দিয়ে তাদের জন্য উপযোগী, অধিক উপকারী বিষয়গুলোকে সমন্বয় করে স্বল্প সময়ের একটি স্বতন্ত্র কারিকুলাম ও শিক্ষা সিলেবাস চালু করা|
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে, এ কাজগুলো করবে কে? অবশ্যই মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডগুলোর উর্ধ্বতন একটি কর্তৃপক্ষ থাকতে হবে। যারা এবিষয়গুলো তদারক করবে।

উপসংহার:

পরিশেষে বলব, পুরোপুরি সরকারের কব্জায় না গিয়ে সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার শাস্ত্রীয় জ্ঞান কওমির ভেতরেই এমনভাবে প্রদান করার প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত, যেন মানুষ বলতে বাধ্য হয়, ‘Monarch Without a Crown’ মুকুট না থাকলেও রাজা তারা। স্মরণ করতে পারি আকবর এলাহাবাদী রহ. এর সেই ঐতিহাসিক উক্তি, ‘দেওবন্দ হল জাগ্রত অন্তরের ন্যায়। নদওয়া তার বিচক্ষণ মুখপাত্র। আর আলীগড়? সে তো সম্মানের সাথে কেবল উদরপূর্তির মাধ্যম।’ দুঃখজনক বিষয় হল, আমাদের মধ্যে এখন জাগ্রত অন্তর নেই। মুখপাত্র হওয়াটাও যেন খামোখা বিষয়। একমাত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু উদরপূর্তি। এখান থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন|

লেখক: মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ; এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ