|| আবদুস সাত্তার আইনী ||
কয়েকটি কারণে কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি সুদূরপরাহত। সেগুলো হলো-
১.
বিদ্যমান শিক্ষাশ্রেণিকাঠামোতে স্বীকৃতিদান সম্ভব নয়। কারণ কওমি মাদরাসার শিক্ষাশ্রেণি বিশৃঙ্খল এবং সুবিন্যস্ত নয়। প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি--১০ বছর; একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি--২ বছর; স্নাতক--৪ বছর; স্নাতকোত্তর--১ বছর -- এরূপ বিন্যাসে কওমি মাদরাসার শিক্ষাশ্রেণিকে বিন্যস্ত করা যাবে না। কিন্তু স্বীকৃতির জন্য এটা জরুরি।
২.
দ্বাদশ শ্রেণি বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সনদের মান দেয় শিক্ষাবোর্ড; স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সনদের মান দেয় বিশ্ববিদ্যালয়। কওমি মাদরাসার শিক্ষার স্বীকৃত সনদের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন এবং এরূপ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এ-দেশে হবে না--এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
বেফাকুল মাদারিস দিচ্ছে জামিয়ার বা স্নাতক-স্নাতকোত্তর শিক্ষাসনদ-এটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি ও ব্যঙ্গবিদ্রূপ হয়েছে।
৩.
কওমি মাদরাসার পরিচালন-পদ্ধতি অনেকটাই পরিবারতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারভিত্তিক। এখানে পরিবারতন্ত্র ও স্বৈরাচার এতটাই সক্রিয় যে, ভিন্নমত পোষণকারীদের ও ভিন্নপথ অবলম্বনকারীদের কোণঠাসা হয়ে থাকতে হয়। সুতরাং মুরব্বিরা প্রকৃতপক্ষে চাইবেন না যে, কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি হোক।
৪.
সরকারি স্বীকৃতি পেলে শিক্ষার মান যা আছে তা কমে যাবে। তখন সনদ অর্জন করাটা মুখ্য হয়ে উঠবে। ঐতিহ্যপন্থীদের জন্য ব্যাপারটা পীড়াদায়ক।
৫.
মাদরাসা-ব্যবসায়ের রমরমা অবস্থা চলছে। কয়েকটি কামরা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা ‘জামিয়া’ নাম লাগিয়ে চার কালারের পোস্টার ছাপিয়ে চটকদার বিজ্ঞাপনী ভাষায় শিক্ষার্থীদের টানতে চাইছে। মাদরাসা-ব্যবসায় করে অনেকেই ইতোমধ্যে বেশ বিত্তশালী হয়েছেন, যদিও কেউ কেউ ফতুর হয়েছেন। অবশ্য কওমি মাদরাসা থেকে শিক্ষা সমাপ্তকারীদের কর্মক্ষেত্র সীমাবদ্ধ বা সঙ্কুচিত হওয়ায় তাদের রুজিরোজগারের জন্য এরূপ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কওমি মাদরাসার সনদের সরকারি স্বীকৃতি হলে এরূপ ‘জামিয়া’ প্রতিষ্ঠা বন্ধ হয়ে যাবে।
আরও বহুবিধ কারণে বিদ্যমান কাঠামো কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি প্রায়-অসম্ভব ব্যাপার। ইতঃপূর্বে সনদের স্বীকৃতির নামে তাদের সামনে মুলা ঝুলিয়ে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। এতে কিছু লোক বৈষয়িক উপকারভোগী হলেও শিক্ষার্থীদের কোনো ফয়দা হয়নি।
পরামর্শ: কওমি মাদরাসার পাশাপাশি যাদের সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজন তারা আলিয়া মাদরাসায় রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষা দিতে পারে। সাধারণ বিভাগে পড়লে নবম শ্রেণি থেকে এবং বিজ্ঞান বিভাগে পড়লে অষ্টম শ্রেণি থেকে আলিয়া মাদরাসার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। আলিয়া মাদরাসাগুলো আগ্রহের সঙ্গে এই সুযোগ দিয়ে থাকে।
লেখক: আলেম লেখক ও বিশ্লেষক
জেডএম/
