|| মুফতি হাসান সানী (রাসেল) ||
মাদক–তিন অক্ষরের একটি শব্দ; অথচ এর প্রভাব ভয়ংকর, এর স্পর্শ সর্বনাশী। এর বিষাক্ত ছোঁয়ায় সম্ভাবনাময় সুন্দর জীবন ডুবে যায় অন্ধকারে, শত সহস্র স্বপ্ন প্রতিনিয়ত ধুলোয় মিশে যায়। মেধা আর মূল্যবান সময় বিক্রি হয়ে যায় নেশার বিনিময়ে। জীবন তখন আর জীবন থাকে না; নেশাই যেন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও মানুষ নিজেকে সফল মনে করতে থাকে। অন্ধকার পথেই সে জীবনের সকল সাফল্য খুঁজে ফেরে। স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন– সবাইকে তুচ্ছ মনে করে। হাসিমুখের আড়ালে সে প্রতিদিন নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। আলো ছেড়ে অন্ধকার বেছে নেয়। সুস্থ বিবেককে বন্দী করে নেশার মায়াজালে। নিজেকে খেলনার পুতুলে পরিণত করে। প্রতিনিয়ত মিথ্যার আশ্রয় নেয়। বন্ধুমহলে অপমানিত হয়, অথচ অপমানের পথকেই সম্মানের পথের চেয়েও দামি মনে করে। সময় গড়িয়ে যায়, জীবনের অর্থ খুঁজে না পেয়ে একসময় আত্মহত্যার দিকেও পা বাড়ায়। এসব কিছুর পেছনে শক্ত অবস্থান নিয়ে ঘাপটি মেরে আছে মাদক।
মানবজীবন ধ্বংসকারী এই মাদক এখন হাতের নাগালেই, সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, তা সেবনের জন্য লাইসেন্সকৃত নিরাপদ স্থানও এখন সহজলভ্য। মাদক, সুলভ মূল্য, আর নিরাপদ আস্তানা– জীবন ধ্বংসের সব আয়োজন যেন সুসজ্জিত হয়ে আমাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই সুসজ্জিত অন্ধকারে সবচেয়ে বেশি পদচারণা যুবসমাজের বড় এক অংশের।
যুবসমাজের আসক্তি:
পৃথিবীর ইতিহাসে যখনই কোনো দেশ, জাতি কিংবা সমাজ ধ্বংস হয়েছে, তখনই সেখানে যুবকদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়– যখন যুবসমাজ ধ্বংস হয়েছে, তখন দেশ বা সমাজ নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেনি। কেননা যুবকরাই জাতির প্রাণ, সমাজের শক্তি।
কিন্তু আজ কথিত সভ্যতার যুগে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, যুবসমাজের বড় এক অংশ সবচেয়ে বেশি অসভ্যতা ও বিশৃঙ্খলায় লিপ্ত। কারণ, তাদের বড় একটি অংশ আজ মাদকে আসক্ত। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি প্রধান কারণ–
ক. আধুনিকতা ও স্মার্টনেসের মোহ:
যুবসমাজের বড় অংশ কেন মাদকে ঝুঁকবে না, যখন মাদক সেবন ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাটাকেই আধুনিকতা আর স্মার্টনেসের পরিচয় বানানো হয়েছে? বন্ধুদের আড্ডায় সেই বন্ধুকেই সবচেয়ে আধুনিক ভাবা হয়, যার কাছে মাদকের খোঁজ কিংবা সরঞ্জাম পাওয়া যায়। যে নিজেকে মাদক কারবারি বা সেবনকারী হিসেবে পরিচয় দেয়, সে-ই নাকি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।
বন্ধুমহলে মাদক সরবরাহকে সাহসিকতার পরিচয় মনে করা হয়। রাতজাগা পার্টি, ক্লাব কালচার, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, একসঙ্গে বসে নেশা করা– এসবই যেন আধুনিক সমাজের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যার কাছে যত দামি মাদক, তার প্রোফাইল তত হাই! স্ট্যাটাস বজায় রাখার নামে অনেকেই মাদকে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি ভদ্র সমাজের যুবকরাও বাহ্যিক আভিজাত্যের আড়ালে এতে সৌন্দর্য খুঁজে পায়।
খ. অবৈধ প্রেম ও মানসিক ভাঙন:
বর্তমান সমাজে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেমে ব্যর্থতা, সম্পর্ক ভাঙন, দাগা খাওয়া– এসবকে আজ ডিপ্রেশনের বড় কারণ বলা হয়। আর যার কষ্ট যত বেশি প্রকাশ পায়, তাকেই যেন আধুনিক ও স্মার্ট মানুষ মনে করা হয়।
হারামে কখনো আরাম নেই। অনৈতিক সম্পর্ক যখন গড়ে ওঠে, তার বিচ্ছেদও হয় বেদনাদায়ক। তখন মানসিক চাপ, হতাশা, নিঃসঙ্গতা, রাত জেগে থাকা, ঘুমহীনতা– সব মিলিয়ে মানুষ এক অসহনীয় যন্ত্রণায় পড়ে। এই কষ্ট ভুলে থাকার ওষুধ হিসেবে অনেকে বেছে নেয় মাদক।
কখনো একাকীত্ব, কখনো রাগ, কখনো প্রতিশোধ, কখনো জেদ– এসব থেকেই জন্ম নেয় নেশা। অথচ মাদক কখনো সমস্যার সমাধান দেয় না; বরং সমস্যা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। সুন্দর ও সভ্য জীবনকে অসভ্যতায় রূপান্তর করে।
গ. বেকারত্ব ও উদ্দেশ্যহীন জীবন:
বেকারত্ব দেশ ও জাতির জন্য এক অসহনীয় অভিশাপ। যুবসমাজ যখন কর্মহীন হয়ে পড়ে, তখন তাদের ঘাড়ে ভর করে হতাশা ও দুষ্ট চিন্তা। পরিশ্রমী যুবক যখন কাজ পায় না, সময় ব্যস্ততায় কাটে না, তখন অলসতা, মানসিক চাপ, হতাশা ও খারাপ সঙ্গ তাকে ধীরে ধীরে মাদকের অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
যে হাতে দেশ গড়ার কথা ছিল, সেই হাত ধ্বংসের পথে এগোয়। যে মেধার আলোতে চারপাশ আলোকিত করার কথা ছিল, সেই মেধাই অন্ধকার ছড়াতে ব্যস্ত হয়। উদ্দেশ্যময় জীবন উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। যে জীবনের সঠিক গন্তব্য নেই, সে জীবন যেকোনো সময় নিভে যেতে পারে।
মাদকের ছোবলে সম্ভাবনাময় জীবন সম্ভাবনাহীন হয়ে যায়। উদ্দেশ্যহীন জীবন যেমন পথ হারায়, তেমনি মাদকাসক্ত জীবন হারায় সম্মান, সময় ও সম্ভাবনা। মাদক প্রথমে আনন্দের প্রতিশ্রুতি দেয়, পরে কেড়ে নেয় হাসি, শান্তি ও জীবনের আসল অর্থ।
ঘ. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব:
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে আজকের যুবসমাজ সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে না। মিডিয়া যখন ভুলকে সত্যের রঙে সাজিয়ে ছড়িয়ে দেয়, তখন অনেকেই না ভেবেই তার পেছনে দৌড়ায়। বিবেক দিয়ে ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
যখন মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, জবাবদিহিতার অনুভূতি এবং নৈতিক মূল্যবোধ ক্ষীণ হয়ে যায়, তখন গুনাহকে আর গুনাহ মনে হয় না। ফলে অসৎ সঙ্গ ও খারাপ পরিবেশ তাকে সহজেই মাদকের দিকে টেনে নেয়।
অথচ ধর্ম মানুষকে সংযম শেখায়, চরিত্র গঠন করে, ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত রাখে। নৈতিক শিক্ষা মানুষকে দায়িত্বশীল, সচেতন ও আত্মনিয়ন্ত্রিত করে তোলে। তাই এ দু’টি থেকে দূরে সরে গেলে বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তখন মাদকাসক্তির মতো ভয়ংকর ব্যাধি তাকে গ্রাস করে।
ঙ. অন্যান্য কারণ:
শুধু এগুলোই নয়; রাতজাগা আড্ডা, অসুস্থ বিনোদন, বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে শুরু করা নেশা– এসব থেকেও জন্ম নেয় আসক্তি। শুরুতে কৌতূহল, পরে অভ্যাস, শেষে সর্বনাশ।
পারিবারিক অশান্তি, ব্যক্তিগত কষ্ট, না বলতে পারা গোপন সমস্যা, অবহেলা, ভাঙা সম্পর্ক– এসবও কখনো কখনো যুবসমাজকে পৌঁছে দেয় মাদকের আখড়ায়।
সমাজের এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়–
এত সহজে কীভাবে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে যুবকদের হাতে? স্বল্প মূল্যে কারা সরবরাহ করছে এই বিষ? শহর থেকে গ্রাম, প্রতিটি এলাকা, প্রতিটি গলিতে কারা ছড়িয়ে দিচ্ছে এই অন্ধকার? এত আইন-কানুন, এত প্রটোকলের পরও কেন হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়? শুধু যুবসমাজই নয়, ছোটরাও কি আজ মাদকের ছোবলে আক্রান্ত? ইনশাআল্লাহ, দ্বিতীয় পর্বে মিলবে এসব প্রশ্নের উত্তর।
লেখক: প্রবন্ধকার, শিক্ষক, ইমাম ও খতিব
আইও/