হজরত হাফেজ্জী হুজুর-এর ইন্তেকালের কয়েক বছর পূর্বের ঘটনা। হুজুর ঢাকার বাইরে কয়েক দিনের সফরে গিয়েছিলেন। কামরাঙ্গীর চর মাদরাসায় তখন গুরুতর আর্থিক সংকট চলছিল। এই সংকট ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকল।
শেষের দিকে একদিন এমন অবস্থা হল যে, অনেক চেষ্টা করার পরও ছাত্রদের খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা গেল না। সেদিন বাবুর্চিখানার চুলায় আগুন জ্বললো না। ছাত্র-শিক্ষক সকলেই পেরেশান হয়ে পড়লেন।
বেলা ১১টার দিকে হুজুর সফর হতে ফিরে আসলেন। মাদরাসায় আগমন করার পরই হুজুরকে এই সংকটের কথা জানানো হল। ঘটনা শোনার পর হুজুর সহসা বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কাঁধের রুমালটি হাতে নিয়ে তা দ্বারা নিজের চেহারা ঢেকে ফেললেন।
অতঃপর বললেন—
“আমার লজ্জা হচ্ছে এই কারণে যে, আজ ছাত্রদের খানার কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি।”
এরপর হুজুর নিজের পকেট থেকে বিশ টাকা বের করলেন। উপস্থিত এক মুরীদ হুজুরের হাতে পঞ্চাশ টাকা হাদিয়া দিলেন।
হুজুর এই সত্তর টাকা একজন শিক্ষকের হাতে দিয়ে বললেন—
“এই টাকা দ্বারা মুড়ি কিনে ছোট ছোট ছাত্রদের খেতে দিন। আর আপনারা মাদরাসার সকল গেট বন্ধ করে দিয়ে মসজিদে গিয়ে দরূদ শরীফের আমল শুরু করুন।”
এ কথা বলেই হুজুর নিজের কামরায় চলে গেলেন। এদিকে মাদরাসার সকল ছাত্র-শিক্ষক মসজিদে জড়ো হয়ে দরূদ শরীফের আমল শুরু করে দিলেন।
প্রায় অর্ধঘণ্টা পর হুজুর মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং মিম্বরে বসেই দুই হাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন। ক্রমে হুজুরের হাত উপরের দিকে উঠতে উঠতে একেবারে সোজা হয়ে গেল। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত হুজুর আল্লাহর দরবারে নিজের অক্ষমতার কথা পেশ করে যাবতীয় হাজতের কথা নিবেদন করলেন।
দোয়া শেষ হওয়ার পর সকলে নিজ নিজ কামরায় চলে গেলেন।
বোর্ডিং ম্যানেজার বাবুর্চিখানার সামনে গিয়ে দেখতে পেলেন— সেখানে একটি বিরাট গরু এবং দুটি খাসি বাঁধা আছে! কে বা কারা এগুলো এখানে বেঁধে গেল, অনেক চেষ্টা করেও এর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না।
হযরত হাফেজ্জী হুজুরকে এই ঘটনা জানানোর পর তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করে সেগুলো জবাই করার হুকুম দিলেন।
এদিকে হুজুর মসজিদ হতে দোয়ার আমল শেষ করে মাদরাসার দফতরে প্রবেশ করার পরই জনৈক অপরিচিত ব্যক্তি দফতরে এসে হুজুরের হাতে একটি কাগজ দিল। তাতে লেখা ছিল—
“হাফেজ্জী হুজুরের হাতে পৌঁছে দাও।”
হুজুর নীরবে তা পাঠ করলেন।
এরপর আগন্তুক হুজুরকে লক্ষ্য করে বলল—
“মাদরাসার জন্য দুটি নৌকা বোঝাই করে চারশ’ মণ চাল এনেছি। সেগুলো মাদরাসায় আনার ব্যবস্থা করুন।”
একথা বলেই লোকটি নীরবে প্রস্থান করল। এই চাল কোথা হতে আসল, কে প্রেরণ করল— তার কিছুই জানা গেল না। সূত্র: বাংলার শত আলেমের জীবনকথা, পৃষ্ঠা–২৩০
জেডএম/