বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


মাদরাসাগুলোতে বিভিন্ন হয়রানির অভিযোগ, সমাধান কোন পথে?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মাওলানা আবু সাঈদ ||

বালিকা মাদরাসাসহ কওমি মাদরাসার যত জায়গায় যতরকমের যৌন-হয়রানি, নির্যাতন, শিশু নিপীড়ন ইত্যাদির সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধীদের কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। এসব অপরাধীর ব্যাপারে আমরা বিন্দুমাত্রও সিম্পেথাইজ নই।

তবে মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া, আবাসিক ব্যবস্থা ওঠিয়ে দেওয়া এসব সমস্যা সমাধানের সঠিক প্রক্রিয়া নয়। শরীরের কোথাও ব্যাধি হলে সে অংশের চিকিৎসা করতে হয়। প্রয়োজনে সেই অংশটুকু কেটে ফেলতে হয়। প্রাণ সংহার করে কেউ সমাধান চিন্তা করে না।

মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে যারা আছে, তারাও মানুষ। অতিমানব বা ফেরেশতা নয়।মানবীয় দুর্বলতা তাদের মাঝেও আছে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, আলিয়া ও অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনে যেমন বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটে, মাদরাসার ক্ষেত্রেও সেরকম হতে পারে। ধানের সাথে চিটা থাকে, চাউলের সাথে থাকে খুদ। তেমনি মাদরাসার লেবাস পোশাকধারীদের মাঝেও কেউ কেউ থাকতে পারে দুশ্চরিত্র বদমাশ। মানুষ তো আর অন্তর্যামী নয়! তাই বাহ্যিকভাবে বোঝারও উপায় থাকে না। ঘটনা ঘটার পরেই বুঝে আসে। তাছাড়া শয়তানের প্ররোচনা তো আছেই।

এসব সমস্যার পরিমাণ কমিয়ে আনা বা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি—

১। জরিপ করলে দেখা যাবে মাদরাসাগুলোতে নিপীড়নের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে ছোট, অপ্রাপ্ত বয়স্ক (ছেলে-মেয়ে) বাচ্চাদের সাথে। নুরানি-নাজেরা, মকতব, হিফজখানা এবং মহিলা মাদরাসা ও কিতাবখানার নিচের জামাতগুলোতে এর পরিমাণ বেশি। এগুলোর এক নম্বর সমাধান হল, এসব স্তরে শিক্ষক নিয়োগে কিংবা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় ইলমি ভার সম্পন্ন বয়স্ক লোক নিয়োগ দান বা বয়স্ক ও বিবাহিত, সন্তানাদি আছে এমন লোক দ্বারা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার বিষয়টি জোরদার ও নিশ্চিত করা। বয়স ও ইলমের ভারহীন মানুষ এসকল অপরাধে দুঃসাহসী হয়। গ্রাম্য প্রবাদ আছে—'বেক্কলের মাইট্যে কইলজা বড় থাকে'।

২। এসব স্তরের শিক্ষার্থীদের বাদ ফজর থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মাদরাসার রুটিনে রেখে খানাপিনা ও রাত্রি যাপন নিজ বাসায় করার সুযোগ রাখা। ১০ বছরের আগে আবাসিক হওয়াকে নিরোৎসাহিত করা।

৩। বালিকা মাদরাসাগুলোর অভ্যন্তরীন সকল কার্যক্রম নারীদের দ্বারাই সম্পাদন করা।

৪। লেনদেন ও যাবতীয় অফিসিয়াল কাজ পুরুষ অভিভাকের মাধ্যমে করা কিংবা নারী দায়িত্বশীলের সাথে নারী অভিভাকদের মাধ্যমে করা। নারী শিক্ষার্থীর সাথে পুরুষ শিক্ষক বা পরিচালকের কোনোরকমের যোগাযোগ বা সাক্ষাতের ব্যবস্থাই না রাখা।

৫। সম্পূর্ণ পৃথক অবকাঠামোগত মজবুত ব্যবস্থাপনা থাকা। অর্থাৎ বালিকা মাদরাসায় পুরুষ পরিচালক এবং যদি পুরুষ শিক্ষক থাকে তাহলে তাদের আসা যাওয়ার রাস্তা থেকে শুরু করে যাবতীয় ব্যবস্থাপনা পৃথক রাখা। শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকের মাঝখানে কাপড়ের পর্দা যথেষ্ট নয়। দেয়াল বা টিনের মজবুত বেড়া থাকা এবং শিক্ষক ও ক্লাসরুমের মাঝখানে নিরাপদ দূরত্ব থাকা।

৬। পরিচালক ও সকল স্তরের পুরুষ শিক্ষক ও কর্মাচারীদের সস্ত্রীক থাকার ব্যবস্থা রাখা বা স্ত্রীসহ থাকার শর্তারোপ করা।

৭। পরিচালক বা শিক্ষক-শিক্ষিকার বাসায় কাজের জন্য কোনো ছাত্রীকে ব্যবহার না করা।

৯। শিশু ও নারী শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত পরিচালক ও শিক্ষক-কর্মাচারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

১০। নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, যৌন হয়রানি ইত্যাদি অপরাধের ধর্মীয় শাস্তি ও দেশীয় আইনে যেসব শাস্তির কথা বলা আছে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ রূপে বাধ্যতামূলকভাবে সেগুলো সবার জানা ও জানানোর ব্যবস্থা রাখা। অফিসে, ক্লাস রুমে, মাদরাসার প্রবেশমুখে দেয়ালে বা ব্যানারে সেগুলো লিখে রাখা।

১১। অভিভাকদের উচিত যে মাদরাসায় আবাসিক রাখতে চাচ্ছেন, খেয়াল করা যে, সেখানে আবাসিক শিক্ষার্থীর পরিমাণ কেমন? যদি এমন হয় যে, শিক্ষার্থীর পরিমাণ খুবই কম। দুই চারজন বাসায় গেলে কারও একাকি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, সেসব মাদরাসায় ছেলে বা মেয়ে বাচ্চাকে আবাসিকে না দেওয়া।

বাসে ওঠার ক্ষেত্রেও কিন্তু এই সতর্কতার কথা বলা হয়। কোনো নারী যাত্রী যদি একা হয় তাহলে যেন বাসে না ওঠে বা সকল যাত্রী বাস থেকে নেমে গেলে কোনো নারী একা যেন বাসে না থাকে। একই কথা আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

১২। শিক্ষক-পরিচালক কেউই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত কোনো নারী শিক্ষার্থীর বিবাহের ঘটকালিতে না জড়ানো। কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য কাউকে সরবরাহ না করা।

১৩। ছুটির দিনে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ছাত্রীকে আনার জন্য অভিভাবক হাজির থাকা। ছুটির পর যেন লম্বা সময় মাদরাসায় অপেক্ষা করতে না হয়।

১৪। একজন পুরুষ শিক্ষকের সাথে মহিলা মাদরাসার মেয়েদের সম্পর্ক শুধু পাঠ গ্রহণ পর্যন্তই। এর বাইরে শিক্ষক শিক্ষার্থীসুলভ আর কোনো সম্পর্কই রাখা জায়েয নেই। এমনকি শিক্ষকের সাথে ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করা, পরামর্শ চাওয়া, তার খোঁজখবর নেওয়াটাও এখানে অন্যায় ও নিষিদ্ধ। এতে শিক্ষক রাগ করুক আর যাই করুক!

১৫। বালিকা মাদরাসায় নিয়োজিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবশ্যই কথায়, মাসআলা ব্যাখ্যায়, ভাব প্রকাশে সংযত ও শালীন হতে হবে। অনেকেই নারী সংশ্লিষ্ট মাসআলাগুলো পড়াতে গিয়ে এতো রসিয়ে বলেন যে, শরীয়তের বৈধ সীমায় আর থাকে না সেই দরস। এসব বিষয় দায়িত্বশীলদের মনিটরিং করতে হবে।

১৬। নারী শিক্ষার্থীরা নিজেরাও অবলা থাকলে হবে না। তাদেরকেও নিজেদের সতীত্ব রক্ষা এবং ইজ্জত আব্রুর ব্যাপারে সর্বোচ্চ সংবেদনশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষক বা পরিচালকের কোনো কথায় বা কাজে ধোঁকায় পড়া যাবে না। গুড টাচ বেড টাচ জানার মতই কোন কথা ও কাজ যৌন ইঙ্গিতমূলক সেগুলো তাকে বুঝতে হবে। অভিভাকগণ বুঝিয়ে দিতে হবে। যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আগেই সতর্ক হওয়া যায়।

১৭। প্রতিষ্ঠান ছোট হোক, বড় হোক, ব্যক্তি মালিকানাধীন হোক বা এলাকার হোক, অবশ্যই সেই প্রতিষ্ঠানে আলেম, খতিব, শিক্ষানুরাগী ও এলাকার বিশিষ্টজনদের সমন্বয়ে ৮ থেকে ১০

জনের একটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, কমিটি বা পরিষদ থাকা। যাদের কাছে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শিক্ষকগণ জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। শিক্ষা ও আভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করবেন না। তবে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কার্যক্রম তারা তাদরক করবেন।

লেখক: মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ

এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ