বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


কোন পথে হেফাজতে ইসলাম?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

বিশেষ প্রতিনিধি

রাত পোহালেই ৫ মে। একটি কালো দিন। ১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে রাজধানীর শাপলা চত্বরে ঘটেছিল বর্বরোচিত ও ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা। সেটি ‘শাপলা হত্যা বা গণহত্যা’ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। সেই ঘটনার পেছনে জড়িয়ে আছে দেশে-বিদেশে আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নাম। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এই সংগঠনটি গত এক যুগের বেশি সময় ধরে দেশের আলেম-উলামা ও দীনদার মুসলমানদের আস্থা ও বিশ্বাসের ঠিকানা হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছে। প্রায় দেড় দশক আগে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি নানা উত্থান-পতন ও জোয়ার-ভাটার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে সংগঠনটি আলোচনায় এসেছে।

হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১০ সালে। মূলত নারী নীতিমালা, শিক্ষানীতি এবং ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এটি আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে। ওই বছরের ৬ এপ্রিল শাপলা চত্বর অভিমুখে লংমার্চে লাখ লাখ জনতার সমাবেশ ঘটিয়ে দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে হেফাজতে ইসলাম। পরবর্তী এক মাস সারাদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে হেফাজত তখন আলোচনার তুঙ্গে উঠে আসে। তবে ৫ মে ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মুখোমুখি অবস্থান নেয় হেফাজতে ইসলাম। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান ঘিরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকায়। সেই রাতে শাপলা চত্বরে অবস্থান করা হাজার হাজার আলেম উলামা ও মাদরাসা নিরীহ ছাত্রদের ওপর লাইট বন্ধ করে বর্বরোচিত ও নজিরবিহীন হামলা চালায় তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে হেফাজত। জেল-জুলুমসহ নানা অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে আলেম-উলামার ওপর। এতে অনেকটা ম্রিয়মান হয়ে যায় সংগঠনটি।

শাপলার ঘটনার পর হেফাজতের পক্ষ থেকে কার্যত বড় কোনো কর্মসূচি আর দেওয়া হয়নি। সরকারের সঙ্গেও এক ধরনের সম্পর্ক স্থাপিত হয় আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই তাঁর নেতৃত্বে ২০১৮ সালে কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি মিলে। এর জন্য শেখ হাসিনাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়।

২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর ঘিরে আবার আলোচনায় আসে হেফাজত। গুজরাট হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে মোদিকে বাংলাদেশে আসতে না দেওয়ার জোর দাবি জানায় সংগঠনটি। এই ইস্যুতে হরতালও পালিত হয়। সেখানে পুলিশের গুলিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হাটহাজারীতে বেশ কয়েকজন নিহত হন। আরেক দফা আলেম উলামার বিরুদ্ধে ব্যাপক ধড়পাকড় চালায় তৎকালীন সরকার। দ্বিতীয় দফার মতো অনেকটা চুপসে যায় হেফাজত। মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী হেফাজতের আমির পদে বহাল থাকলেও নেতৃত্বে আসে বড় পরিবর্তন। সরকারি চাপে ভেঙে দিতে হয় আগের কমিটি। বাদ দিতে হয় আলোচিত অনেককে। 

ইতোমধ্যে হেফাজতের দ্বিতীয় আমির ইন্তেকাল করলে দেশের বর্ষীয়ান আলেম মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আমির নির্বাচিত হন। নেতৃত্বেও আসে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর হেফাজতে ইসলাম তার স্বকীয়তা ফিরে পায়। মাঝখানে ঢাকাকেন্দ্রিক হেফাজতের কার্যক্রমেও গতি আসে। বেশ কয়েকজন নেতার সক্রিয়তায় হেফাজত যেন প্রাণ ফিরে পায়। আল্লামা আহমদ শফী ও আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী পরবর্তী সময়ে হেফাজতে ইসলামে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল তা কেটে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। যদিও হেফাজতকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও ছিল নানা মহলে।

তবে হেফাজতে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল শুরু হয় গত বছর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে। হেফাজতে থাকা ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো জোট প্রশ্নে ভাগ হয়ে যায়। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয়। আর অন্য দলগুলো জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যায়। এতে বিভাজনের সূচনা হয়। আবার হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ভোটের আগে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেয়। তার বিভিন্ন বক্তব্য বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকা হেফাজতভুক্ত ইসলামি দলগুলোকে। এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ না খুললেও ভেতরে ভেতরে একটা ক্ষত তৈরি হয়।

সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সংগঠনের মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতা সাক্ষাৎ করেন। সেখানে সংগঠনকে সক্রিয় করার ব্যাপারে আলোচনা হয় এবং কয়েকটি কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি কর্মসূচি হচ্ছে হেফাজত-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে যে সকল দল ১১ দলীয় জোটে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের সাথে আলোচনার জন্য একটি সাব কমিটি করা হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর সমালোচনার ঝড় ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, ১১ দলীয় জোটে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্য কী। তাহলে যারা বিএনপির সঙ্গে ছিলেন তাদের কী হবে। অনেকে দাবি করেন, মাওলানা মামুনুল হককে মাইনাস করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। অনেকে হেফাজতের আলোচিত নেতা মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষ নিয়ে দাবি করেন, তাকে বাদ দিলে হেফাজতই নাই হয়ে যাবে। যদিও পরে হেফাজতের পক্ষ থেকে কাউকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করা হয়েছে।

তবে বিষয় যাই হোক, হেফাজতে ইসলামের ভেতরে যে একটা বিভাজন ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে সেটা কেউই অস্বীকার করছেন না। এই বিভাজন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটা নিয়েও সন্দিহান সংশ্লিষ্টরা। হেফাজতের দায়িত্বশীল কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বিভাজনের কারণেই হেফাজত সক্রিয় হতে পারছে না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কাছ থেকে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায় করে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটা সম্ভব হচ্ছে না এই কারণেই।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ