সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ ।। ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২৮ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :
‎অতিবৃষ্টি হলে যে দোয়া পড়বেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে: প্রতিমন্ত্রী অমিত বন্যার্তদের পাশে ইসলামী আন্দোলন, চলছে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার নিবন্ধনে একগুচ্ছ জরুরি নির্দেশনা মুহুরী নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে, আতঙ্কে তীরবর্তী মানুষ  বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল পাঁচ বছরে মদিনা জিয়ারত করলেন সাড়ে ১২ কোটি ওমরাহ যাত্রী বন্যা দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে চট্টগ্রামে গেলেন আমিরে মজলিস ইসলামাবাদে শীর্ষ আলেমদের সম্মেলনে মুসলিম ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ২০ জুলাই

বালাকোট দেখিনি, শাপলা দেখেছি


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

মিযানুর রহমান জামীল

‎‎জনস্রোতের বেসামাল ঢেউয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন খালেক ভাই। গলার স্বর সংকুচিত হয়ে এলো আমার। স্লোগানে মুখোর চারদিক। বলছি ২০১৩ সাথে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির পরে শাপলা চত্বরে অখণ্ডিত বেদনার কথা। মহান নেতাকে আমাদের পর্যন্ত আসতে না দেয়ার সেই দগদগে ক্ষত আজও শুকায়নি। মা তার ছেলে হারানোর কথা, বোন তার ভাই হারানোর কষ্ট, স্ত্রী তার স্বামী হারানোর বেদনা কাটিয়ে ওঠতে পারেনি এখনও। বাবা তার সন্তানের রক্তাক্ত লাশের কসম ভাঙতে পারেনি আজও।

‎‎বালাকোট দেখিনি আমি, তবে শাপলাকে শেষ বিকেলের আকাশের মতো দগ্ধ লাল হতে দেখেছি। আমি সাইয়েদ আহমদ শহীদ রহ.কে দেখিনি, দেখেছি শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে। বালাকোটে শিখদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তারিখ ছিল ১৮৩১ সালের ৬মে। আর শাপলায় নাস্তিকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তারিখ ছিল ২০১৩ সালের ৫ থেকে ৬মে। শিখদের মোকাবেলায় যুদ্ধ  সংঘটিত হয় মানশেরা জেলার বালাকোটে আর হেফাজতের ব্যানারে আন্দোলন তীব্র হয় ঢাকার শাপলা চত্বরে। তার পরের ইতিহাস আগুনের স্ফুলিঙ্গ মোড়ানো।‎

‎রাজীব হায়দার ওরফে থাবা বাবাই এ আগুনের মূল সূত্র। ফেব্রুয়ারি ২০১৩ এর ৫ তারিখ থেকে পুরোদমে নাস্তিকরা শাহবাগ চত্বর অবরোধ করে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। এতেই পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সে উত্তপ্ত আগুনে কেরোসিন ঢালে বামপাড়ার মিডিয়াগুলো। ফলে এ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন তাওহীদি জনতার ঈমান ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরও তীব্র আকার ধারণ করে।‎

‎সেদিন চারদিক কাঁপিয়ে রাজপথ মুখোর হয়ে ওঠেছিল। শাপলা চত্বরে লাখো জনতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক লংমার্চ। ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিলের প্রজন্ম দেখেছিল মহা এক জাগরণ। ঐতিহাসিক ১৩ দফা ছিল মুসলমানদের প্রাণের দাবী ঈমানের দাবী। ১৩ দফার পক্ষের শক্তি ছিল লক্ষ লক্ষ তাওহিদী জনতা আর বিপক্ষে ছিল বাম পাড়া ও রাষ্ট্রীয় কর্তাদের পা চাটা হলুদ মিডিয়া।‎

‎ধর্মপ্রাণ মানুষ সারা দেশ থেকে শাপলায় যোগ দিতে থাকে। ঢাকার দিকে ছিল গণমানুষের বাঁধভাঙ্গা জোয়ার। ফ্লাইওভারের শেষ সীমানা পর্যন্ত দীর্ঘ মিছিল। পূর্ণ হয়ে ওঠে সড়ক মহাসড়ক। কাকরাইল থেকে রমনা, কমলাপুর থেকে আরামবাগ, বাবুবাজার থেকে গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ি থেকে জনপথ, প্রতিটি পয়েন্ট মতিঝিলে একাকার হয়ে যায়। এগিয়ে চলে সাদা টুপি আর পতাকার কাফেলা। উঁচু দালান আর বহুতল ভবনগুলোয় প্রতিধ্বনিত হয় আল্লাহু আকবারের সুর।

‎‎ঢাকা অভিমুখে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ কর্মসূচিতে অংশ নেয় মাদরাসা স্কুল কলেজ ভার্সিটিসহ জনসাধারণের বিশাল বহর। নাস্তিক বিরোধী এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন দেশের প্রবীণ আলেম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.। ৬ এপ্রিল লংমার্চের পর জেলায় জেলায় শানে রেসালাত সম্মেলন সংঘটিত হয়। এ গণমুখী আন্দোলনের জোয়ারে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে হেফাজতে ইসলামের নাম । এর ৩০ দিন পর ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ডাক আসে। ‎

‎আমি তখন বটতলী মাদরাসায় দাওরায়ে হাদীস পড়ি। শত বাধা প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে, রাষ্ট্রীয় বাধা উপেক্ষা করে, কাকর বিছানো পথ মাড়িয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে তৌহিদী জনতার বহর।

‎সরকারি হরতালের পরও সেই বাধা উপেক্ষা করে একটি শক্তিমান কাফেলার সাথে আগের দিন সাইনবোর্ড মাদরাসায় অবস্থান পৌঁছি। পরদিন বাদ ফজর পতাকা হাতে হুমায়ুন ভাইসহ আমরা সাইনবোর্ড মহাসড়কে উঠি। এরই মধ্যে মামুন মুস্তফি ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে আমাদের "অবরোধ" সাময়িকী প্রকাশিত হয়। আমার নাসাঈ শরীফের উস্তাদ মুফতি নাসির উদ্দিন আনসারী হাফি. এর সাথেও সাক্ষাৎ হয়।‎

‎যাত্রাবাড়ি থেকে কাঁচপুর ব্রিজের গণজোয়ারে সরকার প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র অবরোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। হামলা মামলার ভয় দেখিয়ে, জেলায় জেলায় গাড়ি আটকিয়ে, ঢাকার প্রবেশ পথে চেকপোস্ট বসিয়েও অবরোধ বানচাল করতে পারেনি। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আগের দিন রাতেই ঢাকায় প্রবেশ করতে থাকে হেফাজতে ইসলামের লাখো কর্মী।

‎হেফাজতের ডাকে ঈমানি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে কর্মীরা শাপলায় জড়ো হতে থাকে। দুপুরের আগেই মতিঝিল থেকে আরামবাগ, দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত কর্মীদের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যায়।‎

‎সরকারের পেটুয়া বাহিনী ও একটি কুচক্রী মহল কুরআন শরীফ এবং বইয়ের দোকানে আগুন লাগিয়ে অবরোধ কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে ধীরে ধীরে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে থাকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আকাশের মেঘ আর কালো ধুয়া একাকার হয়ে যায়।

‎ইতোমধ্যে স্টেজের সামনে কয়েকটি রক্তাক্ত লাশ নিয়ে আসা হয়। এ দৃশ্য দেখে কান্না আর ক্ষোভে ফেটে পড়েন অনেকেই। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দুহাত তুলে মুরুব্বিরা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান। নেতৃবৃন্দ শাপলার মঞ্চ থেকে শক্তি সাহস আর মনোবল নিয়ে জাগরণ অব্যাহত রাখার নির্দেশনা প্রদান করেন। কর্মীদের অনেকে ভয় আতঙ্ক আর অজানা আশঙ্কায় ভুগলেও মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে তৈরি হয়ে যান। আমীরে হেফাজতের অপেক্ষায় রাতে সবাই শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন।‎

‎আমীরে হেফাজতের জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকে। রাত ১০টায় পরিবেশ কিছুটা হালকা হলেও ভয় কাটেনি অনেকের। সঙ্গে থাকা প্রয়োজনীয় আসবাব হাতছাড়া। কারও চশমা, ঘড়ি, কারো টুপি আবার কারও জুতা এমনকি হাতের যোগাযোগ ব্যবস্থার মোবাইলটাও সময়ের ব্যবধানে অদৃশ্য হয়ে গেল। সারা দেশের মানুষ অবস্থা জানার জন্য বসে আছেন টিভির পর্দার সামনে। কিন্তু সরকারকর্তৃক চ্যানেলগুলো কৌশলে চাপপ্রয়োগ করে রাতেই সরিয়ে দেয়া হয়।‎

‎মধ্যরাত। কেউ তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়ানো, কেউ জিকিরে ব্যস্ত। আবার সারা দিনের ক্লান্তির কারণে কারও চোখে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। এরই মধ্যে অনেকে অবস্থান নেন পাশ্ববর্তী মসজিদ ও বহুতল ভবনের নিচের সম্মুখ করিডোরে। কেউ ফিরে যান নিকটস্থ মাদরাসা বা এতিমখানায়। শাপলায় তখনও অর্ধ লক্ষ কর্মী। দৈনিক বাংলার দিক থেকে নেমপ্লেটের লাইটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এক সময় শাপলা ও তার আশপাশে দুনিয়ার অন্ধকার নেমে আসে। ঠিক তখনই আকাশে বিদ্যুৎ চমকিয়ে বোমা ফাটতে থাকে। বিকট আওয়াজে চারদিক আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে সাউন্ড গ্রেনেড শহরের দালানগুলো চুরমার করে দিচ্ছে যেন।‎

‎মঞ্চের মাইকগুলো বন্ধ। কর্মীরা কোনো নির্দেশ না পেয়ে দিকবিদিক ছুটতে থাকে। কেউ কেউ

‎ঘুম থেকে উঠার আগে বুলেট বিদ্ধ হয়। পুলিশ এবং ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসের লাঠির আঘাত কর্মীদের মাথা থেতলে দিতে থাকে। যাকে যেভাবে পায় পিটিয়ে হাত পা ভেঙ্গে রক্তাক্ত করে আধমরা বানিয়ে তারপর ছেড়ে দেয়। অনেকের বাঁচার আকুতি তাদের কাছে শিশুদের খেলনার চেয়ে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। অপমান অপদস্ত করে গায়ের পোশাক ছিঁড়ে মাথা ফাটিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। এরই মধ্যে অনেকেই পরপারে পাড়ি জমান। সরাসরি গুলিকরে হত্যা করা হয় অসংখ্য কর্মীকে।

‎আমাদের পাশের গ্রামের (মালিবাগ জামিয়ার ছাত্র) আনোয়ার শাহ মওদুদকেও শহীদ করা হয়। ‎

‎ভোররাতে যাত্রাবাড়ি বড় মাদরাসার কোনো এক ফ্লোরে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি। দীর্ঘ ক্লান্তির পরও সাহেদ এসে বলল, 'ভাই সমাবেশ ভেঙে দিয়েছে। অনেক কর্মীকে হত্যা ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।' খালেক ভাইয়ের কথা মনে পড়তেই বুক কেঁপে উঠলো। আমরা দুজন একসাথেই ছিলাম। শেষ দিকে আশরাফুল আরেফিন এবং মাহমুদসহ আরও অনেকেই ছিল। আমার পাশে তারা কেউ নেই এখন। সংগ্রামের পথে কাছের মানুষের সামান্য আড়াল হওয়াও বড় কষ্টের।

‎এভাবে ধীরে ধীরে চিকিৎসকের উপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করে অনেককে মারা হয়েছে হসপিটালের বিছানায়। কাউকে মারা হয়েছে তিলে তিলে, বন্দি করে জেল থেকে জেলে। কাউকে মামলা দিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আবার কাউকে এলাকায় নজরবন্দি করেও ১১টি বছর চাপে রাখা হয়। সেদিন জাতি দেখেছিল বাকস্বাধীনতার চরম বিপর্যয়। এ জুলুম অত্যাচারের পরও একশ্রেণির সহজাতকে একটুও অনুশোচনা করতে দেখা যায়নি।

‎কবির ভাযায়—

‎স্বাধীন থেকেও লাভ কি যাদের

‎বন্দি বিবেক পিঞ্জিরে

‎জ্ঞান গরীমার বড়াই তাদের

‎খাক চেটে খাক খিঞ্জিরে।‎

‎আজও সেই গণহত্যার বিচার হয়নি। আলেম ওলামা ও মিডিয়ার পক্ষ থেকে বার বার এ দাবি উঠলেও মীরজাফরদের দাবার গুটি থেমে নেই। আড়াল থেকে ইন্ধন যোগাচ্ছে ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ, জগৎ শেঠ, উর্মিচাঁদ ও খোজাদের মতো মীর জাফররা। শাপলায় সশরীরে উপস্থিত থাকা প্রত্যক্ষদর্শী একজন আহত কর্মী হিসেবে অনতিবিলম্বে সরকারের কাছে খুনীদের বিচারের দাবী জানাচ্ছি।‎

‎লেখক: কবি ও গবেষক


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ