বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে শাপলার সেই কালরাতের বর্ণনা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

৫ মে ২০১৩। আজ থেকে ঠিক ১৩ বছর আগের কথা। ইতিহাসের এক ভয়াল কালো অধ্যায়। সেদিন নবী-প্রেমিকদের এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ছিল রাজধানীর শাপলা চত্বর ঘিরে। ১৩ দফা দাবি নিয়ে সমবেত হয়েছিল তারা। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আকাশ-বাতাস ভারী হতে থাকে। চারদিকে গুলি, সাউন্ডগ্রেনেট আর টিয়ারশেলের আওয়াজ। হেলিকপ্টর থেকে গরম পানি বর্ষণ। সে দিনের সে ট্রাজেডি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে রাতের আঁধারে। নবীপ্রেমী নিরস্ত্র মানুষের ওপর একযুগে চতুর্মুখী হামলা চালায় পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি। বিদ্যুৎ নেই। চারদিকে অন্ধকার। রক্তে রঞ্জিত পিচঢালা পথে একের পর এক লাশ পড়ছে নবীর আশেকদের। সেদিনের সেই ভয়াল রাতে অনেক বোন বিধবা হয়েছ। অনেক মা হারিয়েছে তার আদরের কলিজার টুকরো সন্তান। ঠিক কতজন শহীদ হয়েছিল সেই রাতে—দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও তার সঠিক হিসাব আজও অজানা।

সে রাতের কিছু খণ্ডচিত্র আমরা সবাই দেখেছি। যে চিত্রগুলোর কথা মনে হলে আজও রাতের ঘুমে দুঃস্বপ্নের কালো ছায়া পড়ে। ভেবে দেখুন, যারা সেখানে উপস্থিত ছিল তাদের কী অবস্থা হয়েছিল! প্রত্যক্ষদর্শীদের সে রাতের কথা মনে হলে কেমন হয় মনের অবস্থা? ইতিহাসের সেই কালো রাত থেকে বেঁচে ফেরা কয়েকজনের মুখোমোখি হয়েছেন আওয়ার ইসলামের সহ-সম্পাদক ইমরান ওবাইদ। তাদের স্মৃতিচারণে ভেসে উঠেছে শাপলা ট্রাজেডির খন্ড খন্ড চিত্র। যা কখনো ইতিহাস থেকে মোছার নয়।

মাওলানা আল আমীন। গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট। পিতার নাম, ইমদাদুল হক। তিনি সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে। আমি তখন ছোট—মিজানের ছাত্র। ফজরের আগে আমরা বের হয়েছিলাম—আমি আর আমার সাথীরা। প্রথমে যাই বারিধারা মাদরাসায়। সেখান থেকে ফজরের নামাজ পড়ে বের হই। সাথে ছিল আমার প্রিয় বন্ধু উসামা। আমরা বুঝিনি সামনে কী অপেক্ষা করছে, তবুও এক অদ্ভুত টানে মানুষের স্রোতে মিশে গিয়েছিলাম।

গাজীপুর পর্যন্ত মিছিল গিয়েছিল। তারপর হঠাৎ ঘোষণা—‘শাপলা চত্বর যেতে হবে!’ কোনো প্রশ্ন ছিল না, কোনো দ্বিধা ছিল না। যেন হৃদয়ের ভেতর থেকেই উত্তর আসছিল—‘চলতে হবে’।

আমরা রওনা হলাম। পথ সহজ ছিল না—বরং প্রতিটি মোড় ছিল একেকটি পরীক্ষা। কোথাও সংঘর্ষ, কোথাও উত্তেজনা। হঠাৎ এক ঘোষণা বাতাস কাঁপিয়ে দিলো—‘মিছিলের সামনে গুলি চালানো হয়েছে, (শহীদ হয়েছেন কেউ) সবাই প্রস্তুত থাকুন!’

এক মুহূর্তের জন্য বুক কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু, সেই ভয় আমাদের থামাতে পারেনি। বরং মনে হচ্ছিল—আজ পেছনে ফেরার দিন নয়।

নানান বাধা, ভয়, অনিশ্চয়তা পেরিয়ে আমরা যখন শাপলা চত্বর-এ পৌঁছালাম, তখন সময় প্রায় আড়াইটা। মনে হয়েছিল, আমরা যেন কোনো সাধারণ স্থানে নয়—ইতিহাসের এক জীবন্ত মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছি।

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা, আর সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। স্টেজ থেকে দোয়া চলছিল—সেই দোয়া যেন আকাশ ভেদ করে আরশে পৌঁছানোর আকুতি। বিকেলের দিকে কয়েকজন শহীদের নিথর দেহ স্টেজে আনা হলো। সেই দৃশ্য—ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী থমকে গেছে।

মাগরিবের নামাজ পড়েছিলাম এক কোণে। সেখানেও আক্রমণের আশঙ্কা—আমরা আবার সরে গেলাম। রাত বাড়ছিল, আর অনিশ্চয়তা ঘনীভূত হচ্ছিল।

রাত দশটা-এগারোটার দিকে এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম—ফিরে যেতে হবে। বড় ভাইদের একজন বললেন—কমলাপুর হয়ে বের হতে।

আমরা হাঁটছিলাম, আবার দৌড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ—আমরা পথ বদলাচ্ছিলাম, ছুটছিলাম অন্যদিকে।

সেদিন রাতের গভীরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চারদিকের বাতাস ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠছিল। ককটেলের শব্দ, দৌড়ঝাঁপ, আতঙ্ক—সব মিলিয়ে এক অচেনা রাত।

চারদিকে আহত মানুষ, রক্তাক্ত শরীর—রিকশায় করে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। সেই দৃশ্যগুলো আজও চোখে লেগে আছে।

ঠিক তখন, উসামা আমার হাত শক্ত করে ধরে বলল—‘দোস্ত, যা-ই হোক, হাত ছাড়বি না।’

সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—এই হাতটাই যেন আমার সাহস, আমার নিরাপত্তা। ঢাকার অচেনা শহরে, অন্ধকার রাতের ভেতর, আমরা দুজন হাত ধরে দৌড়াতে থাকলাম।

অবশেষে কমলাপুর স্টেশন হয়ে ট্রেনে বিমানবন্দরে আসি। তারপর বসুন্ধরা হয়ে মাদ্রাসায়। পরেরদিন ঘুম ভাঙার পর যে খবর শুনলাম—তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

চারদিকে শুধু একটাই কথা— অসংখ্য নবীপ্রেমিক শহীদ হয়েছেন। হৃদয়ের ভেতরটা যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল। মনে হলো, আমরা শুধু একটি রাত পার করিনি—আমরা একটি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছি, যার মূল্য রক্তে লেখা। নবীপ্রেমের এক বিরল ইতিহাস

মাওলানা শেখ মাহমুদুল হাসান। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার তেরশিরা গ্রামের শাহজাহান শেখের সন্তান। তিনি জীবনের সেই ভয়াবহ রাতের কথা স্মরণ করে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে। আমি তখন মিরপুর ৬ নম্বরের দারুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্র। মাদ্রাসাটি ছিল কমিটি শাসিত; অর্থাৎ যখন যে দল ক্ষমতায় আসত, তারাই মাদ্রাসাটি পরিচালনা করত। স্বাভাবিকভাবেই তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ, তাই আওয়ামী লীগ বিরোধী কোনো প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করা শিক্ষক এবং ছাত্র উভয়ের জন্যই নিষিদ্ধ ছিল। তবুও ঈমানি তাগিদে আমরা ২০-৩০ জন ছাত্র, ৪ মে বিকেলে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে আরজাবাদ মাদ্রাসায় সমবেত হই।

পরের দিন ৫ মে সকালে ফজরের পর আমরা মিছিল নিয়ে গাবতলী যাই। সেখানে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে অবস্থান কর্মসূচি ছিল।

দুপুরের পর সিদ্ধান্ত হয় শাপলা চত্বরে যাওয়ার। আসরের সময় যখন শাপলা চত্বরে পৌঁছাই, তখন সেখানে উত্তেজনা তুঙ্গে। খবর আসে বায়তুল মোকাররম ও গুলিস্তানে পুলিশি অভিযানে অনেক সাথী আহত হয়েছেন।

বিকেলের দিকে খবর এলো আল্লামা আহমদ শফী (রহ.)-কে লালবাগে আটকে রাখা হয়েছে। এতে বিক্ষোভের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।

রাত তখন কয়টা বাজে ঠিক মনে নেই, হঠাৎ সরকারি বাহিনী অভিযান শুরু করে। চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়া হচ্ছিল। আমি কিছুটা খাটো গড়নের হওয়ায় মাথা নিচু করে বেঁচে যাই, কিন্তু আমার চোখের সামনে অনেকের টুপি গুলির আঘাতে উড়ে যেতে দেখি।

পালানোর জন্য শুধু সায়েদাবাদ ও কমলাপুরের রাস্তা খোলা ছিল। আর্তনাদ আর কান্নার শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছিল তখন। আমার এক বন্ধুর পায়ে ১০৮টি স্প্লিন্টার বিঁধেছিল। আরেক বন্ধু দেয়াল টপকে ভেতরে গিয়ে জানাল যে সেখানে অসংখ্য আহত হেফাজত কর্মী পড়ে আছে। অতি কষ্টে একটি গলিতে ঢুকে আমরা প্রাণ বাঁচাই।

আমি সেই বিভীষিকাময় রাতে হেফাজতের বড় বড় নেতাদের তেমন কাউকে দেখিনি। তবে মাওলানা মামুনুল হক সাহেবকে দেখেছি। তখন তার মাথায় টুপি ছিল না; রাগ-অভিমানের ছাপ চেহারায় স্পষ্ট। তিনি কোন দিক থেকে আসছিলেন এবং কোন দিকে যাচ্ছিলেন, এখন ঠিক মনে নেই।

ফজরের সময় নিকটস্থ এক মসজিদে আশ্রয় নেই। সেখানে গিয়ে দেখি মসজিদের মেঝেতে শুধু রক্ত আর আহতদের আহাজারি। সেখান থেকে ছদ্মবেশ ধারণ করে (পাঞ্জাবি ছেড়ে শার্ট-প্যান্ট পরে) আমরা মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। অনেক কষ্টে একটা সিএনজি নিয়ে মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের সামনে নামি এবং পায়ে হেঁটে মাদ্রাসায় পৌঁছাই। পথে খবর পেলাম যে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ স্টেশনে ও বিভিন্ন পয়েন্টে হেফাজত কর্মীদের আক্রমণ করছে। এবং মাদ্রাসায় গিয়ে শুনি যারা আন্দোলনে গিয়েছিল তাদের বহিষ্কার করা হবে।

এদিকে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ না থাকায় বাড়িতে রটে যায় যে আমি 'শহীদ' হয়েছি। বাবা-মা, দাদি ও আত্মীয়স্বজন সবাই কান্নাকাটি করছিলেন। পরে এক বন্ধুর ফোন থেকে বাড়িতে যোগাযোগ করলে তাঁরা আশ্বস্ত হন। এরপর ভাই টাকা পাঠালে নতুন পোশাক কিনে ছদ্মবেশে রাতে বাড়ি ফিরে যাই। সেই রাতের বিভীষিকা এখনো ভুলতে পারিনি।

মাওলানা বিন ইয়ামিন। সিরাজঞ্জের এনায়াতপুরের ফয়জুর রহমানের সন্তান। তিনি সে রাতের স্মৃতিচরণ করতে গিয়ে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি আজও অমলিন। ২৯ এপ্রিল আমি ঢাকায় পৌঁছাই। আমি তখন অসুস্থ ছিলাম। সেই ঘটনার কিছুদিন আগেই আমার অপারেশন হয়েছিল। তবুও সেদিন আন্দোলনে যোগ দেই। তবে সে দিন আমি সুস্থই ছিলাম। আমার মধ্যে কোনো দূর্বলতা কাজ করেনি।

পোস্তগোলা দিয়ে, বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে শাপলা চত্বরে পৌঁছাই। যখন মূল সংঘাত শুরু হয়। তখন আমি শাপলা চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থান করছিলাম।

রাত বাড়ার সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাইকিং করে আমাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। একপর্যায়ে চারপাশের আলো নিভিয়ে দিয়ে শুরু হয় টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ। প্রাণ বাঁচাতে আমরা ছোটাছুটি শুরু করি। আমি সোনালী ব্যাংকের পেছনের দেয়ালের কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় হাত ও পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পাই।

সে রাতে এমন কিছু দৃশ্য দেখেছি যা ভোলা সম্ভব নয়। আন্দোলনের অস্থায়ী মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত ট্রাকটি মানুষের চাপে যখন পেছনে সরছিল, তখন তার নিচে চাপা পড়ে কয়েকজনকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছি। শাপলা চত্বরের দক্ষিণ পাশের রাস্তায় পুলিশের গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখেছি। এলাকা ছাড়ার সময় লক্ষ্য করি, বিভিন্ন ভবনের ভেতরে অনেককে হাত-পা বেঁধে আটকে রাখা হয়েছে।

অনেক কষ্টে ভোরবেলা যখন কোনোমতে গেন্ডারিয়ায় জামালুল কুরআন মাদ্রাসায় পৌঁছাই, তখন ফজরের আজান দিচ্ছিল। পরবর্তী কয়েকদিন পুরো এলাকা ছিল থমথমে। বাইরের জগতের সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল না। আমাদেরকে কয়েকদিন মাদরাসা থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি।

হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান। গ্রামের বাড়ি নরসিংদী। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৫ মে শাপলা চত্বরের আন্দোলনে যোগ দিতে আমি ও আমার ছোট ভাই নরসিংদী থেকে ঢাকায় আসি। দিনভর মিছিল আর সমাবেশের পর বিকালের দিকে আমরা শাপলা চত্বরের মূল স্তম্ভের কাছে অবস্থান নিই। চারদিকে তখন চরম উত্তেজনা। আমাদের সামনেই জিরো পয়েন্টে এক ভাই শহীদ হলেন। সেই রক্তাক্ত লাশ যখন মিছিলে এলো, চারপাশের মানুষের মনের অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না।

আমরা একটা আতঙ্কে ছিলাম। তারপরও যে আল্লাহর রাস্তায় নামলাম, আল্লাহ ভরসা, ‘তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’—এরকম একটা ভরসা নিয়ে আমরা মাঠের মধ্যে অবস্থান করি। আমাদের সাথে অনেক সাথীভাই ছিল যারা চলে গেছে, তারপর আমরা যাই নাই। যেহেতু ঘোষণা আসছে যে আল্লামা আহমদ শফী সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি যতক্ষণ পর্যন্ত মাঠে না আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ যাব না। তো আমরা অপেক্ষা করতে থাকি।

একবার আমরা মাঠে অবস্থান করি, আবার এই মতিঝিলের পাশে একটা মাদ্রাসা আছে—মাদ্রাসার নামটা আমার জানা নাই—তো ওই মাদ্রাসায় আমরা এশার নামাজ পড়ার জন্য যাই। তো ওইখানে গিয়াও মসজিদের ভিতরে দেখতে পাইলাম দুইটা লাশ পড়ে আছে। দুইটা যুবকের লাশ যারা শহীদ হইছে আল্লাহর রাস্তায়। এর মধ্যে একজন মনে হয় জেনারেল শিক্ষিত। তারপর এগুলি দেখে মানে আমাদের শরীরের লোম দাঁড়ায়ে যায়। তখন আমাদের ভিতরে একটা ভয় কাজ করছিল।

মাগরিবের সময় পানির তীব্র সংকট দেখা দিলে আমরা সাথে থাকা পানের পানি দিয়েই অজু সেরে নামাজ পড়ি। রাত যত গভীর হচ্ছিল, আতঙ্ক তত বাড়ছিল। চারপাশ থেকে ককটেল আর গুলির শব্দ আসছিল। রাত ১২টার পর একে একে আশপাশের সব বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ক্লান্তিতে অনেক মানুষ তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন, কেউবা জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল।

রাত আনুমানিক ৩টার দিকে হঠাৎ চারদিক থেকে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়। মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড আর গুলির শব্দে মনে হচ্ছিল যেন কিয়ামত শুরু হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে আমি ছোট ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে দৌড় দিই। হুড়োহুড়িতে পায়ের স্যান্ডেল, চশমা আর ব্যাগ হারিয়ে যায়। চোখের সামনে অনেক মানুষকে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়তে দেখলাম, কিন্তু কাউকে উদ্ধার করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

একপর্যায়ে ভিড়ের চাপে ছোট ভাইটি আমার হাত থেকে ছুটে যায়। চরম উদ্বেগ নিয়ে আমি প্রাণ বাঁচাতে জনতা ব্যাংকের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ি এবং সাততলার ছাদে আশ্রয় নিই। সেখানেও টিয়ারগ্যাস ছোড়া হয়েছিল। সেই বিভীষিকাময় রাতে ছাদের ওপর বসে আমরা কেবল আল্লাহর সাহায্য চাইছিলাম।

ভোরবেলা প্রশাসনের লোকজন আমাদের বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখি জুতো, জায়নামাজ আর তসবি। বের হওয়ার সময় পুলিশের অমানবিক আচরণ ও লাঠিপেটা সহ্য করতে হয়েছে। তারা বলছিল—বাইর হ, বাইর হ, আরও আসবি? আরও আসবি? আহমদ শফীর ডাকে আরও আসবি? শিক্ষা হয় নাই তোদের? বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজ, বিভিন্ন ধরনের এমন বাজে ব্যবহার তারা আমাদের সাথে করছে।

তবে সেনাবাহিনীর ব্যবহার আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো ছিল। সেনাবাহিনী আমাদেরকে বলতেছে যে—বাবা আর আসবা না তোমরা, যাও চলে যাও, সোজা চলে যাও, সোজা যাও। সেনাবাহিনী আমাদের সাথে এরকম খারাপ কোনো ব্যবহার করে নাই। কিন্তু পুলিশ আমাদের সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করছে। এমন আচরণ করছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। পুলিশ ছাত্রদেরকে পাইলেই মোটা লাঠি দিয়ে মারছিল। আমাকে দুইটা বাড়ি দেয়। প্রায় এক মাসের মতো দাগ ছিল বাম পাশের রানের মধ্যে। অবশেষে সকালে যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসায় পৌঁছে পরিচিতদের দেখা পাই।

কারী মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০১৩ সালের সেই সময় আমি ঐতিহ্যবাহী জামিয়া আরাবিয়া দক্ষিণ মেজবাহনগর মাদরাসায় হেদায়াতুন্নাহু জামাতে পড়ি। তখন আন্দোলনের ডাক আসে। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সেখান থেকে বাসে করে মাদারীনগর মাদরাসায় এসে রাত্রিযাপন করি। ফজরের নামাজের পর হালকা নাস্তা করে আমরা আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বের হই।

মাদারীনগরের সামনের রাস্তাটা আমরা বন্ধ করে দেই। জোহরের আগ পর্যন্ত আমরা রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন চালিয়ে যাই।

সে দিন বৃষ্টি হয়েছিল। জোহরের আগ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ বৃষ্টিতে ভিজে আন্দোলন করছিল। পরে বৃষ্টি থামলে আমরা ফরিদাবাদ মাদরাসায় যাই। জোহরের পর জানতে পারি শাপলা চত্বরে যোগ দিতে বলা হয়েছে। সবাই শাপলা চত্বরের দিকে রওনা হই।

আমরা যখন শাপলা চত্বরে পৌঁছি, এর একটু পরই একপাশ থেকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন আক্রমণ শুরু করে। তবে তা জোড়ালো ছিল না, হালকা। সেখানে মঞ্চের সামনেই আমরা ছিলাম। আলেমগণ ভাষণ দিচ্ছিল। রাতে একটি লাশ আসে মঞ্চে। আমি দেখেছি। তখন আর বাঁচার আশা ছিল না। মনে মনে শাহাদাতের নিয়ত করে ফেলি।

রাত গভীর হলে পুলিশ, র‍্যাব ও সেনাবাহিনী চারদিক থেকে শাপলা চত্বরে আক্রমণ শুরু করে। যুদ্ধের মতো গ্রেনেড ও বোমার আওয়াজ হতে লাগল। বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছিল তারা, কোথাও দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা ছিল না। আমি নিজেকে বাঁচাতে শাপলা চত্বরের গ্রিলের নিচে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু তারা অনবরত গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছিল। এরপর আমরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে শুরু করি। আমি দেখেছিলাম, জীবন বাঁচতে মানুষ দেয়ালের কাঁটাতারের ওপর দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল।

আমি দৌড়ে একটি ভবনে ঢুকি। সম্ভবত সেটি একটি ব্যাংক ছিল। সেখানেও মানুষের ভিড় ছিল অনেক। মাটিতে পা ফেলার জায়গা নেই। ঠেলাঠেলি আমি পাঁচতলার ওপর উঠে যাই। ভিড়ের মধ্যে আমি আমার প্রয়োজনীয় জিনিস হারিয়ে ফেলি।

পুলিশের ছোঁড়া টিয়ারশেলের গ্যাসে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমার কাছে থাকা একটি পলিথিন মুখে দিয়ে আমি শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করি। পুলিশ বারবার টিয়ারশেল নিক্ষেপ করছিল।

ফজরের আজান হলে, পুলিশ মাইকে ঘোষণা করে, বেরিয়ে এলে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমরা হাত উঁচিয়ে বের হতে শুরু করি। বের হওয়ার সময়ও পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন আমাদের ওপর লাঠিপেটা করছিল।

আমরা কোনোমতে সেখান থেকে যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসায় গিয়ে আশ্রয় নিই। সেখানে গিয়ে দেখি পাশের রাস্তায় গুলি চলছে। মাদ্রাসায় এসে আমাদের পাশের গ্রামের একটি ছেলেকে শহীদ অবস্থায় দেখতে পাই। তার লাশ আমরা গ্রামে পাঠাই।

পরের দিন আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পায়ে জুতা নেই, মাথায় টুপি নেই— শুধু হাতে একটি তসবি নিয়ে ফিরছিলাম। বাসে ফেরার পথে বিভিন্ন মোড়ে বাস থামিয়ে আমাদের ওপর হামলা করা হয় এবং গালিগালাজ করা হয়।

শাপলা চত্বর থেকে ফেরার পর এক সপ্তাহ আমি ঠিকমতো খেতে পারিনি। চোখের সামনে শুধু সেই লাশ আর রক্তের দৃশ্য ভেসে উঠত। সেই ভয়াবহ স্মৃতিগুলো আজও আমার মনে গেঁথে আছে।

মো. ছফির আহমেদ বাশারী সে দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, আমার বয়স তখন ১৬। আমি তখন একুতা কারিমিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা সাওরাইদ, কালিগঞ্জ, গাজীপুরে হিফজ পড়ি। হুজুরের কাছে ছুটি চাইলে তিনি বাড়ি যাওয়ার ছুটি দিয়ে দেয়।

ছুটি পেয়ে গাজীপুর থেকে নরসিংদী আসি। বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে ১১ জন মিলে মাদানীনগর মাদরাসায় যাই। মাদরাসায় যখন পৌঁছি, রাত তখন ১১ টা।

পরেরদিন সকালে বিশাল মিছিলে যোগ দিয়ে ঢাকা ডেমরা চৌরাস্তা মোড় অবরোধ করি। দুপুর ১২ টায় শাপলা চত্বরের দিকে যেতে বলা হয়। মিছিল নিয়ে আমরা শাপলা চত্বরে চলে আসি। দুপুর ৩ টার দিকে, বিভিন্ন জায়গা থেকে আক্রমণের খবর আসছিল। আমাদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গরম পানি ফেলা হয়। এবং আমার সামনেই বুলেটের মাধ্যমে অনেক ভাইদেরকে শহীদ করা হয়েছে যা আমি ও আমার সঙ্গীরা স্বচক্ষে দেখেছি। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে অনেক শহীদ ভাইয়ের  লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

রাত ১০টার সময় আমরা যে যার মতে রাস্তায় ঘুমানোর প্রস্তুতি নেই। কারোও মাথার নিচে ইট। কেউ জুতা মাথার নিচে দিয়ে শোয়ে পড়ি।

রাত যখন ৩ টা ১৫, জালিমেরা বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়। গুলি চালাতে শুরু করে। মুসলমান ভাইদেরকে চোখের সামমে পাখির মতো গুলিগুলিবিদ্ধ হয়ে মরতে দেখেছি। একের পর এক লাশ মাটিতে পড়ছিল। রাস্তা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল।

তারপর অনেক কষ্টে আমরা শাপলা চত্বরে পাশেই মতিঝিল মাদারাসায় পৌঁছি। সেখানে গিয়ে দেখি, এক ভাইয়ের লাশ সেখানে পড়ে আছে। তার ১ কান বরাবর গুলি করা হয়েছে, যা অন্য কান বরাবর দিয়ে বের হয়েছে।

তখন নিরুপায় হয়ে আমরা রাস্তায় যে যার মতো শুয়ে পড়ি। সে জায়গাটা ছিল মতিঝিল মাদ্রাসার সাইডে এক গলিতে। সেখানেও সেই হায়েনার দল আমাদের আক্রমণ করার জন্য পিছু নেয়।

সেদিন আমার এক ছাত্র ভাইয়ের পায়ে গুলি লাগে। আমরা এক বিল্ডিং এর উপর আশ্রয় নিয়েছিলাম বাঁচার জন্য। গুলি চালানো শুরু হলে আমরা লাফিয়ে নিচে নামতে চাচ্ছিলাম। বিল্ডিংটায় কাজ চলছিল। অনেক জং ধরা প্যারেক পড়ে ছিল। আমাদের জুতা ছিদ্র হয়ে পায়ে পেরেক ঢুকেছে। হাতে-পায়ে পেরেক ঢুকে ক্ষতবিক্ষত হয়েছি আমরা। সে রাতের ঘটনা আজও মনে হলে গা শিউরে ওঠে। পরে আল্লাহর রহমতে নিরাপদে গন্তব্যে ফিরতে পেরেছিলাম।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ