|| মুফতি সিদ্দিকুর রহমান ||
কুরআন মানব জাতিকে প্রথম ও সর্বপ্রথম যে বার্তাটি দিয়েছে তা হলো—اقرأ—‘পড়’ তথা, জ্ঞানার্জন কর। (সুরা আলাক, ০১)
ইসলামি দৃষ্টিতে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্ঞানার্জন ফরজ। রাসুল সা. বলেন—طلبُ العِلمِ فريضةٌ على كلِّ مسلمٍ
শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা মানুষ ও একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সে অধিকার পূরণের লক্ষ্যেই পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থা। প্রণীত হয়েছে বিভিন্নতর শিক্ষা ও সিলেবাস। বিশ্বের অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থা ও সিলেবাস আমাদের প্রতিদিনকার আলোচনায় না-এলেও দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও সিলেবাসের বিচিত্রতা দিবসের ন্যায় স্পষ্ট।
আমাদের দেশে প্রধানতম তিনটি শিক্ষাব্যবস্থা চলমান। যার একটি হলো কওমি শিক্ষাব্যবস্থা। যে শিক্ষাব্যবস্থা সরকারের কোনো প্রকার দান-অনুদান ছাড়া জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দানানুদানে যুগ-যুগ ধরে এ দেশে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। যা কওমি শিক্ষাব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
এছাড়াও এ-শিক্ষাব্যবস্থার রয়েছে স্বকীয়তা ,নিজস্বতা এবং এমন কর্মপদ্ধতি যা তাকে অন্যসব শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আলাদা করে অনন্য এক উচ্চতায় তুলে ধরেছে।
কওমি শিক্ষাব্যবস্হার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আবাসিক ব্যবস্থাপনা। দেশের প্রায় সকল কওমি মাদরাসায় ছাত্র-শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। ছাত্ররা চব্বিশ ঘন্টা উস্তাদদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যায় থাকে। তারা চব্বিশ ঘন্টার এক সুচিন্তিত রুটিনের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করে।
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম,খাবার ,গোসল, খেলাধুলা ও অন্যান্য প্রয়োজন সেরে বাকি সময় পড়াশোনা করতে হয়। সময় বেঁধে থাকে চব্বিশ ঘন্টা উস্তাদদের নেগরানি।
ফলে উস্তাদগণ প্রতিটি ছাত্রকে পরিচর্যা করতে পারেন, যেমন পরিচর্যা করতে পারে একজন বাগানের মালি তারা বাগানে থাকা প্রতিটি চারা গাছকে। এমন নিবিড় পর্যবেক্ষণ আর নিরন্তন পরিচর্যায় বাহারি ফুলে ভরে ওঠে বাগান।
প্রতিটি ছাত্রের শুকনো হৃদয় একদিন জ্ঞানের পত্র-পল্লবে সতেজ ও সবুজ হয়ে ওঠে। তাদের পরম যত্ন আর অবিরাম পরিচর্যা প্রায় ভেঙ্গে পড়া কান্ডের ন্যায় হাজারো ছাত্রকে একসময় ফুল হয়ে ফুটতে সাহায্য করে।
কলি হয়ে অযত্নে পড়ে থাকা ছাত্রগুলো গোলাপের ন্যায় বিকশিত হতে থাকে।
চারদিকে ছড়াতে থাকে সেই বিকশিত গোলাপের সুরভি। এদেশের মাটি ও মানুষ যার সাক্ষী!
কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় পরম যত্নে চলে পাঠদান—
কওমি মাদরাসায় রয়েছে সুনির্ধারিত ক্লাস রুটিন। নির্ধারিত সময়ে ক্লাস শুরু ও শেষ হয়। ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। থাকে অনুপস্থিতির জবাবদিহিও।
ক্লাসের প্রতি উস্তাদগণও থাকেন সদা যত্নবান। থাকে তাদের নিয়মানুবর্তিতা। উস্তাদগণ ক্লাসে ছাত্রদেরকে পরম যত্নে পাঠদান করে থাকেন। পাশাপাশি ছাত্রদের অধিকারের প্রতি রাখেন তারা পূর্ণ সতর্কতা ও সজাগ দৃষ্টি।
নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করার ব্যাপারে থাকেন পূর্ণ মনোযোগী। পাঠদানের এমন ব্যবস্থা কওমি মাদ্রাসার অনবদ্য এক অধ্যায়।
কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে অনন্য এক সিলেবাস। কওমি মাদরাসাগুলো দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সিলেবাসে প্রাধান্য পেয়েছে কুরআন-হাদিস তথা ইসলামি জ্ঞান।
শুরু হয় সহিহ-শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষা- হিফজ দিয়ে আর শেষ হয় কুরআন - হাদীসের গভীর তাফসির ও বিস্তর ব্যাখ্যা - বিশ্লেষণের মাধ্যমে। কুরআন - হাদীস গভীরভাবে বুঝতে সহায়ক জ্ঞানেরও পাঠদান চলে। যেমন, ইলমে নাহু, সরফ,বালগাত, ও ইলমে মানতেক।
স্বল্প পরিসরে বাংলা, ইংরেজি এবং গণিতও রয়েছে এ শিক্ষা সিলেবাসে। যুগ-যুগ ধরে যে সিলেবাস ইলমে ওহীর তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হাজারো হৃদয়কে সিক্ত করে যাচ্ছে। সে সিলেবাস পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সিলেবাস।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ।
