বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


স্মৃতিপটে অম্লান এক রূহানি মজলিস

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| খন্দকার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ||

গত রবিবার উস্তাযে মুহতারাম শায়খুল হাদিস আল্লামা হাফেজ নুরুল হক সাহেব হাফিযাহুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। হযরতের ইমামতিতে এশার নামাজ আদায়ের সৌভাগ্য হলো। নামাজে তাঁর সুমধুর ক্বেরাত শুনে অন্তর বিগলিত হয়ে এল। মনে হচ্ছিল প্রতিটি আয়াতের অর্থ যেন আমার হৃদয়ে কড়া নাড়ছে আর আমাকে সতর্ক করছে।

প্রথম রাকাতে তিনি সূরা ফুরকানের সেই আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন, যেখানে কিয়ামতের দিন জালেমের আক্ষেপের কথা বলা হয়েছে:

وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا (২৭) يَا وَيْلَتَىٰ لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا (২৮) لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي ۗ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا (২৯)

অনুবাদ:  আর সেদিন জালেম ব্যক্তি (অনুতাপে) নিজের হাত দুটি দংশন করবে এবং বলবে, ‘হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! অবশ্যই সে আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে উপদেশ (কুরআন) পৌঁছার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।’

দ্বিতীয় রাকাতে তিনি পরের অংশটুকু তেলাওয়াত করলেন:

وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا (৩০) وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا مِّنَ الْمُجْرِمِينَ ۗ وَكَفَىٰ بِرَبِّكَ هَادِيًا وَنَصِيرًا (৩১) وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً ۚ كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا (৩২)

অনুবাদ:  আর রাসূল বললেন, ‘হে আমার রব! আমার কওম তো এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছে।’ আর এভাবেই আমি অপরাধীদের মধ্য থেকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি; আর পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে আপনার রবই যথেষ্ট। আর কাফিররা বলে, ‘পুরো কুরআন তার কাছে একবারে কেন নাযিল করা হলো না?’ এভাবেই আমি তা (অল্প অল্প করে) নাযিল করেছি আপনার হৃদয়কে এর দ্বারা মজবুত করার জন্য এবং আমি একে স্পষ্টভাবে ক্রমে ক্রমে পাঠ করেছি।

সচরাচর দেখা যায়, নামাজ শেষ হওয়ার পর ইমাম সাহেব কোন আয়াত পড়েছেন তা আমরা অনেকেই মনে রাখতে পারি না। কিন্তু হযরতের তেলাওয়াতের মধ্যে এমন এক গভীর প্রভাব ছিল, যা আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। আসলে আল্লাহওয়ালা মানুষের সাহচর্য যেন কলুষিত অন্তরের জন্য এক রূহানি মহৌষধ। নামাজের পর হযরত যখন মসজিদে জিকিরে মশগুল ছিলেন, তখন বাইরে থেকেই আমি হৃদয়ে এক প্রশান্তি অনুভব করলাম। সেই টানেই আবার মসজিদে ঢুকে তাঁর কাছাকাছি গিয়ে বসলাম।

ভেবেছিলাম নামাজের পর যখন তাঁর সাথে একান্তে বসব, তখন নামাজে পড়া আয়াতগুলো নিয়ে কিছু আলোচনার আবদার করব। কিন্তু সাক্ষাতের সময় অন্যান্য কথার ভিড়ে তা আর বলা হলো না। এরই মধ্যে আমার বড় ছেলে হাফেজ মাওলানা ওবায়দুল্লাহ তার বন্ধু হাফেজ মাওলানা ফরহাদকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলো। সবাই মিলে হযরতের দ্বীনি নসিহত শুনছিলাম। হঠাৎ করেই হযরত আমার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে কিছু উপদেশ দিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর কথায় এশার নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে পড়া সেই আয়াতগুলোর প্রসঙ্গই ফিরে এল। তিনি বিশেষ করে দুটি বিষয়ে জোর দিলেন:

১. পবিত্র কুরআনের সাথে প্রতিদিনের সম্পর্ক রাখা। শত ব্যস্ততার মাঝেও যেন অন্তত ১৫ মিনিট কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। আর সময় থাকলে যেন আরও বেশি পড়া হয়।

২. রাতের একাংশ আল্লাহর জন্য বরাদ্দ রাখা। তিনি সূরা বনী ইসরাইলের সেই আয়াতটি পড়ে শোনালেন:

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا (৭৯)

অনুবাদ:  আর রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ পড়বেন, যা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য; আশা করা যায় আপনার রব আপনাকে ‘মাকামে মাহমুদ’ বা প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।

হযরত এখানে ‘তাহাজ্জুদ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বুঝিয়ে বললেন, এর মূল অর্থ ঘুম হওয়া হলেও এখানে ‘বাবে তাফাউল’-এর বৈশিষ্ট্যের কারণে এর অর্থ হবে ঘুম ত্যাগ করা। অর্থাৎ প্রিয় রবের প্রেমে নিজের আরামের ঘুমকে বিসর্জন দেওয়া। এরপর তিনি আল্লাহর মহব্বত নিয়ে আলোচনা করলেন এবং শেখ সাদী (রহ.)-এর ‘বোঁস্তা’ থেকে একটি ফারসি পঙক্তি আবৃতি করলেন:

اسیرش نخواهد رهایی ز بند

شکارش نخواهد خلاص از کمند

অনুবাদ: “আল্লাহর প্রেমের জেলের বন্দিরা কখনো মুক্তি কামনা করে না।”

হযরতের মজলিস মানেই ইলমি আলোচনা, আধ্যাত্মিক খোরাক আর আকাবেরদের জীবন্ত ইতিহাস। তিনি জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী ও দারুল উলুম দেওবন্দের বুজুর্গদের গল্প শোনান। যেন পুরনো দিনের সেই সোনালী ইতিহাস নতুন করে প্রাণ পায়।

تازہ خواہی داشتن گر داغ ہائے سینہ را

گاہے گاہے باز خواں قصہِ پارینہ را

অনুবাদ:  "যদি তুমি হৃদয়ের ক্ষতগুলোকে সতেজ রাখতে চাও, তবে মাঝেমধ্যে অতীত মনীষীদের জীবনগাথা পাঠ করো।"

উল্লেখ্য, হাফেজ নুরুল হক সাহেব দীর্ঘ দিন ধরে কাতারে হাদিসের দরস দিচ্ছেন। সিহাহ সিত্তার কিতাবগুলোর ওপর তাঁর এই পাঠদানের ভঙ্গি যেন প্রাচীন যুগের মুহাদ্দিসদের কথা মনে করিয়ে দেয়। কোনো ফি বা নিবন্ধনের ঝামেলা নেই, সবার জন্য উন্মুক্ত এই দরস। দেশি-বিদেশি অসংখ্য ছাত্র সেখানে ভিড় করে। একদিন এক আরব ছাত্র মুগ্ধ হয়ে বলছিলেন, "আমি মিশরের আল-আজহারসহ অনেক জায়গায় হাদিসের দরস শুনেছি, কিন্তু হাফেজ নুরুল হক সাহেবের মতো এমন গভীর ও উপকারী ব্যাখ্যা কোথাও পাইনি।"

যাঁরা ইলমে হাদিসের এই রূহানি আসরে শরিক হতে চান, তাঁরা প্রতি শুক্রবার ফজরের নামাজের পর দোহার ‘জীদা ব্রিজ’ সংলগ্ন মসজিদে চলে আসতে পারেন। সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টার এই মজলিস আপনার জীবনের পাথেয় হয়ে থাকতে পারে।

লেখক: কাতার প্রবাসী

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ