মোরশেদ জাহান । ।
আসরের নামাজ শেষে মসজিদের আঙ্গিনায় হাঁটাহাঁটি করছে মাহিন। বিকেলের সময়টা কোথায় কাটানো যায়! ভাবছে একলা মনে। গ্রামে আসা হয়নি বহুদিন। গেলো রাতে ছুটে এসেছে তাই মা-মাটির টানে। গ্রামীন সবুজ প্রকৃতি বরাবরই তাকে কাছে টানে। হাতছানি দেয় অবারিত সবুজ মেঠোপথ। খালপাড়টাতে বসার কথা ভাবছে একবার, আবার অন্য কোথাও ঘুরে দেখার ইচ্ছে জাগছে তার মনে। সংশয়ের দোলাচলে পায়চারি করছে এদিক-ওদিক।
গাঁয়ে মাহিনের ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গী হাতেগোনা দু-চারজন। দশ বছর বয়স হতেই বাড়ির বাইরে সে। প্রাইমারি শেষ করে মাদরাসায় পড়াশুনা শুরু। পাড়ায় বন্ধুবান্ধব বলতে তেমন কেউ নেই।
গ্রামে এলে পাশের পাড়ার এক খৃস্টান বন্ধুর সঙ্গে গ্রামটা ঘুরে দেখে। বন্ধুটা তার বেজায় ভদ্র। বেশ ভালো মনের অধিকারী। মেধাবীও তুখোড়। শারিরীক অসুস্থতা ও পারিবারিক টানাপড়েনে লেখাপড়ায় এগোয়নি বেশিদূর। তবে গণিতে বেশ পারদর্শী। এলাকায় গণিতে তার যথেষ্ট নামডাক। প্রাইভেট পড়তে স্টুডেন্টরা যথারীতি তার কাছে ভীড় করে।
মাহিনের সমবয়সী হওয়ায় দুজনের বোঝাপড়াটাও ভালো। আজ সে ভীষণ ব্যস্ত। ব্যক্তিগত কিছু কাজের অজুহাত দিয়েছে বন্ধুকে। ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গী হিসেবে তাই তার দেখা মিলছে না। মাহিনের সময় কাটানোর অন্য সঙ্গী হলেন মহল্লার মসজিদের ইমাম হাফেজ মাহবুব।
‘মাহিন ভাই! চলেন। হাটে যাবো। কিছু কেনাকাটা আছে।’ হুট করে তার ভাবনায় ফাটল ধরলো। ইমাম হাফেজ মাহবুব কোত্থেকে এসে হাজিরা দিলো। সালাম বিনিময় সেরে প্রস্তাবটি করলো।
‘আপনি এসেছেন! ভালোই হলো। বিকেলটা কীভাবে কাটাবো, ভাবছিলাম।’ মাহিন পেছন ফিরে মৃদু হেসে জানালো।
মসজিদের আঙ্গিনা ছেড়ে জোর কদমে এগিয়ে চললো তারা। হাটের দূরত্ব কিলো দেড়েক হবে। চলতে চলতে মাহবুব মাহিনকে তার কলেজজীবনের নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন করলো- ‘নতুন পরিবেশ, ভিন্ন পরিবেশ, দাড়ি-টুপি নিয়ে ক্লাস করতে কেমন বোধ করছেন কলেজে?’
মাহিনও তার প্রশ্নগুলির জবাব দিতে লাগলো। বহুদিনের সখ্য তাদের মাঝে। জীবনের কতো কী গল্প জুড়ে গেছে, যাচ্ছেও বা নিজেদের অজান্তে। আলাপে আলাপে একটা সময় হাটে পা পড়লো তাদের। হাটটা বেশ জমেছে আজ। উপচেপড়া ভীড় চারদিকে।
‘মাহবুব ভাই! হাতে কিন্তু সময় নেই তেমন।’ তাড়া দিলো মাহিন।
সূর্যটা প্রায় ঢলে পড়েছে। মাগরিব ধরতে হবে। তড়িঘড়ি তাই কেনাকাটা শেষ করে নিলো তারা। এবার বাড়ির পথ ধরার পালা। হাট থেকে বেরোবার নাম করতেই দেখা জয়দেবের সঙ্গে। জয়দেব পাশের এলাকার হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা। পেশায় কাঠমিস্ত্রি। ইয়া বড় সাইজের দুটো ব্যাগ হাতে বাড়ি ফিরছে সে। ব্যাগভর্তি সদাইপাতি।
বাড়ি ফেরার পথটি বেশ অকেজো। ভ্যান-গাড়ি চলাচলের উপযোগী নয় একদমই। পথ চলতে হয় তাই পায়ে হেঁটেই। একসঙ্গে দুটো ব্যাগ বহন করা! তাও আবার এতোটা পথ! অসম্ভব প্রায় জয়দেবের জন্য।
ওর অবস্থা দেখে মাহবুব এগিয়ে গেলো। একটি ব্যাগ ওর হাত ফসকে নিজের হাতে নিতে চাইলো। জয়দেব অবশ্যি খুব জোরাজুরি করলো না দেবার জন্য। তবু মাহবুব ব্যাগটি ওর হাত থেকে কেড়ে নিলো।
এরপর পথ চললো সামনের। মাহিনও হা করে দাঁড়িয়ে থাকেনি। এগিয়ে এসে বললো- ‘জয়দেব কাকা! আপনার ব্যাগেà