বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ ।। ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ২৪ জিলহজ ১৪৪৭

শিরোনাম :
এবারের হজে ৬৪০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করেছে সৌদি আরব ‘বাজেটের পরিধির চেয়ে নিত্য পণ্যের দাম কমার সংবাদ চায় জনগণ’  সরকারের ৫ বছরের মেগা কর্মপরিকল্পনা ‘ভারতে ধর্ম গ্রহণের স্বাধীনতা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত’ ‘যোগ্য দায়িত্বশীল হতে প্রয়োজন আদর্শিক ও দক্ষতার উন্নয়ন’ আল আকসার ঐতিহাসিক নিদর্শন সরানোর অপচেষ্টা ইসরাইলের, হামাসের সতর্কবার্তা আর্থিক খাতে রাজনীতি নয়, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে: গাজী আতাউর রহমান ইলমি সংকট নিরসনে মাদরাসা দায়িত্বশীলদের জন্য কিছু কথা ১৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে পুলিশের জন্য গাড়ি কিনছে সরকার দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি: বাণিজ্যমন্ত্রী

ব্যালফোর ঘোষণা: অযোগ্যের পক্ষে অনধিকার চর্চা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

ইসমাইল আমিন

আরব-ইসরায়েল সংকট গত একশত বছর যাবৎ পৃথিবীর সবচে বড়ো সংকট। এই কৃত্রিম সংকটের সূচনা হয় ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফোরের একটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে। যেটা ছিলো ১৯১৫ সালে মক্কার শরিফ (ওসমানী শাসনামলে পবিত্র মক্কা-মদিনার গভর্নরদের উপাধি)-এর সাথে বৃটেনের কৃত চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ।

এসব ছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা। যুদ্ধের শুরুর দিকে মক্কার শরিফ হুসাইন ইবনে আলীর নেতৃত্বে আরব জাতীয়তাবাদীরা ওসমানী সালতানাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেয়। সালতানাত থেকে বিচ্ছিন্ন আলাদা আরব রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করছিলো তারা । এর জন্য দরকার পড়ে মিত্র বাহিনীর সমর্থন।

এই লক্ষ্যে বিদ্রোহী নেতা শরিফ হুসাইন এবং মিশর ও সুদানের বৃটিশ হাইকমিশনার ম্যাকমাহনের মাঝে পত্রযোগে আলোচনা হয়। আরব জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে হুসাইন তার প্রস্তাবিত আরব রাষ্ট্রের পরিধি ও চাওয়া-পাওয়া তুলে ধরে ম্যাকমাহনের নিকট। বৃটেনের পক্ষ হয়ে দরকষাকষি করে ম্যাকমাহন।

আলোচনায় তিনি শামের কিছু খ্রীস্টান অধ্যুষিত অঞ্চল, ও উপসাগরীয় কতিপয় রাজ্য প্রসঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও ফিলিস্তিনকে আরব রাষ্ট্রর্ভুক্ত করা নিয়ে কোন আপত্তি করেননি। আরব জাতীয়তাবাদীরা চুক্তি মেনে নেয় এবং মিত্রশক্তির হয়ে ওসমানী সালতানাতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে।

কিন্তু বৃটেন তার কথা রাখেনি। কয়েকমাস পরই সে তার চুক্তিভঙ্গ ও প্রতারণার স্বভাবজাত নীতি প্রয়োগ করে। একদিকে হুসাইনকে আরব রাষ্ট্র তৈরির প্রতিশ্রুতি দিলেও অন্যদিকে সে রাশিয়ার সম্মতিতে ফ্রান্সের সাথে আরব ভূখণ্ডগুলোকে আগাম ভাগ করে নেয়। সেই ভাগ বাটোয়ারায় ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক শাসনব্যাবস্থার অধীনে রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

ফিলিস্তিন বিষয়ে আরেকটু পেছন থেকে আলোচনা করা যাক। মুসলিম উম্মাহের আবেগ বিজড়িত এই ভূমিতে একটি ইহুদি রাষ্ট্র তৈরির জন্য ইহুদিরা বহুকাল ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। তাদের এই আন্দোলনকে জায়নবাদী আন্দোলন বলা হয়। এই আন্দোলনের নেতারা ফিলিস্তিন অর্জনের জন্য লোভনীয় নানা প্রস্তাব দিয়ে ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদকে বাগে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা এতে ব্যর্থ হয়। আব্দুল হামিদ এক ইঞ্চি ভূমি ছাড়তে তো রাজি হননিই বরং ফিলিস্তিন নিয়ে ইহুদিদের সবরকম ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে প্রানপণ চেষ্টা চালিয়ে যান।

নিরাশ হয়ে জায়নবাদী নেতারা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর দরবারে ধরণা দেয়। তারাও চাপ প্রয়োগ করে সুলতানকে তাঁর নীতি থেকে টলাতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে ইহুদি ও আন্তর্জাতিক শক্তির যুগপৎ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আব্দুল হামিদ ওসমানী সিংহাসন থেকে অপসারিত হন। তাঁর অপসারণের বছর কয়েক পরেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জায়নবাদীরা তাদের অর্থ ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিন অর্জনের চেষ্টা জোরদার করে ।

অর্থের মাধ্যমে কার্যসিদ্ধি ইহুদিদের পুরনো নীতি। ইহুদি নেতারা অর্থনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ ১৮৬৯ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগে ইহুদি রাব্বি রাইখোনের (Raikhon) দেয়া একটি বক্তৃতার অংশবিশেষ উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানে তিনি ইহুদীদেরকে অর্থশক্তি ও স্বর্ণের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে বলেন , "এই পদ্ধতিতে তোমরা আর্থিক ঋণ প্রত্যাশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে পারবে।" তিনি আরো বলেন, "কৃষক শ্রেণীও আর্থিক সংকটে পড়লে তাদের কৃষিকাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য ঋণ চাইতে বাধ্য হবে। এতে তারা ইহুদি পুঁজির কোলে নিক্ষিপ্ত হবে। এভাবে আমরা উপযুক্ত সময় এলে অচিরেই এমন কিছু বিপ্লব ঘটাবো, যা ইহুদি ছাড়া অন্য সব জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেবে আর ঠিক তখনই ইহুদি জাতির জন্য ইয়াহুদার প্রতিশ্রুতি (ইসরাইল প্রতিষ্ঠা) বাস্তবায়িত হবে।"

অর্থে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ইহুদীদের জন্য যাদুর মতো কাজ করেছে। এর মাধ্যমে তারা ঋণী করেছে বড়বড় সব দেশকে। এক্ষেত্রে বিখ্যাত রথচাইল্ড পরিবারের কীর্তি অবিস্মরণীয়। প্রায়শই বৃটেন তার সংকটকাল অতিক্রম করে থাকতো রথচাইল্ড পরিবারের অর্থ দিয়ে। মিশর যখন ঋণের চাপে পড়ে ১৮৭৫ সালে সুয়েজ খাল থেকে নিজেদের অংশ বিক্রি করে দিতে যাচ্ছিলো, বৃটেন সেটা রথচাইল্ড পরিবার থেকে নেয়া ঋণের অর্থে কিনে নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও রথচাইল্ড পরিবার আর্থিকভাবে বৃটেনকে প্রচুর সহায়তা করে।

অর্থের পাশাপাশি ইহুদিদের জ্ঞান তাদের আরেক শক্তিশালী অস্ত্র। প্রযুক্তিগত বিভিন্ন উদ্ভাবনের মাধ্যমে তারা পরাশক্তিগুলোকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করে তোলে। এতে স্বাজাতির নানা স্বার্থগত বিষয়ে বিশ্বশক্তির সহানুভূতি লাভ সহজ হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষ হয়ে প্রথম রাসায়নিক মরণাস্ত্র ক্লোরিন ব্যবহার করে মিত্রবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে দেয় ইহুদী রসায়নবিদ ফ্রীজ হাবের Fritz Haber। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি রবার্ট ওপেনহাইমের আবিষ্কৃত পারমাণবিক বোমার কথা আর কি-ইবা বলার থাকে !

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উদ্ভাবনী শক্তির এক অভিনব প্রকাশ ঘটায় বিখ্যাত জায়নবাদী নেতা হেইম ওয়েইজম্যান। এই বিজ্ঞানী বৃটেনের হয়ে এসিটনের বানিজ্যিক উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন করে। যার ফলে এর উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, যা পরিণতিতে শক্তিশালী বিস্ফোরক কর্ডাইট উৎপাদনকে গতিশীল করে তোলে, যা বিশ্বযুদ্ধে বৃটেনের জন্য যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ওয়াইজম্যানের এই কীর্তি বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যালফোর ও তার দেশের নীতিনির্ধারকদেরকে ঋদ্ধ করে। এতে তার জায়নবাদী দাবিদাওয়ার প্রতি বৃটিশ কর্তৃপক্ষের সহানুভূতি তৈরী হয়। যা ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ফিলিস্তিকে ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি বানাতে বৃটিশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি সংবলিত প্রসিদ্ধ ব্যালফোর ঘোষনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ (অবশ্য এটিই একমাত্র কারণ নয়)। বিখ্যাত সেই ব্যালফোর ঘোষণাপত্রের মূলপাঠ ছিলো এমন—

"মহামান্য সরকার ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে এবং এ উদ্দেশ্য পূরণে তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যবহার করবে। এর ফলে ফিলিস্তিনে অবস্থানরত অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার এবং অন্যান্য দেশের ইহুদিদের অধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে না।"

এই ঘোষণার পরপরই সারা বিশ্ব থেকে ইহুদীদের স্রোত বয়ে যায় ফিলিস্তিন অভিমূখে। ১৯১৭ সালে যেখানে ৯ পার্সেন্ট ইহুদি ছিলো, সেটা তৎকালীন এই পরাশক্তির ছত্রছায়ায় ১৯৩৫ সালে ২৭ পার্সেন্টে গিয়ে দাঁড়ায়। এমনকি ব্যালফোর ঘোষণার একত্রিশ বছরের মাথায় অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্রও অস্তিত্বে চলে আসে।

মাত্র ৬৭ শব্দের এই ব্যালফোর ঘোষণা ছিলো তৎকালীন ফিলিস্তিনে বসবাসরত ৯১ পার্সেন্ট আরব ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি জুলুমের সুস্পষ্ট ইশতেহার। গত একশত বছর সেই জুলুম প্রত্যক্ষ করে আসছে বিশ্বমানবতা।

সে সময় জনসংখ্যার বিচারে ফিলিস্তিনে না ইহুদিদের যোগ্যতা ছিলো 'ইসরায়েল' প্রতিষ্ঠার আর না বৃটেনের নৈতিক অধিকার ছিলো এই কাজে ইহুদিদের সহায়তা করার। বরং এটি তো ছিলো শরিফ হোসাইন ও আরব বিশ্বের সাথে বৃটেনের কৃত চুক্তির অন্যথা। আবার অন্য দিক থেকে তাকালে দেখা যায়, এটি ছিলো মুসলিম ভাইদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সহায়তাকামী শরিফ হুসাইনের মতো গাদ্দারদের প্রতারিত হওয়ার ইতিহাসে নতুন সংযোজন।

লেখক: ইফতা, দ্বিতীয় বর্ষ, মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী

-এটি


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ