|| মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানী ||
প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজের ন্যায্য অধিকার অর্জনের একটি মাধ্যমও বটে এবং যদি প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সীমা ও শর্তহীন হয়ে পড়ে, তবে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীও বটে। প্রতিবাদের মূল উদ্দেশ্য হলো- জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। জুলুমের প্রতিবাদ করা এবং সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকে কোনো বিষয়ের ওপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা নিশ্চিতভাবেই মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর অন্তর্ভুক্ত; ইসলামও এই অধিকারকে স্বীকার করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আল্লাহ মন্দ কথা উচ্চস্বরে বলা পছন্দ করেন না, তবে সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন, যার ওপর জুলুম করা হয়েছে। আর আল্লাহ সব কিছু শোনেন ও জানেন।’ (সুরা নিসা-১৩৮)
আল্লাহ তায়ালার এই ইরশাদ থেকে জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে উপযুক্ত উপায়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের বৈধতা প্রমাণিত হয়। জুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার মধ্যে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া, প্রতিবাদী সভা করা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী মিছিল তো রয়েছেই; বর্তমান গণমাধ্যমের যুগে খবরের কাগজ, রেডিও এবং অন্যান্য মাধ্যমের সাহায্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং সরকারের অন্যায্য আচরণের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে সরকারের কাছে প্রতিনিধি পাঠানো এবং অন্যান্য আইনি উপায়ে নিজেদের ক্ষোভ ও রাগ প্রকাশ করাও এর মধ্যে শামিল।
প্রতিবাদের জন্য এমন মাধ্যম বেছে নেওয়া যার ফলে সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষতি না হয়—এরও অবকাশ রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলেন, আমার এক প্রতিবেশী আমাকে নিয়মিত কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পরামর্শ দিলেন, তোমার আসবাবপত্র বের করে রাস্তায় রেখে দাও। ওই ব্যক্তি নিজের জিনিসপত্র নিয়ে রাস্তায় রেখে দিলেন। সেখান দিয়ে যিনিই অতিক্রম করতেন এবং এ বিষয়ে জানতে চাইতেন, ওই ব্যক্তি বলতেন যে, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দেয়, তাই আমি আমার এই জিনিসপত্র বাইরে বের করে রেখেছি। অতিক্রমকারী তখন বলত: তার ওপর আল্লাহর লানত হোক, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করুন! পরিশেষে ওই প্রতিবেশী এসে অনুরোধ করল যে, আপনি নিজ বাড়িতে ফিরে চলুন, আজ থেকে আমি আপনাকে আর কখনো কষ্ট দেব না। (তাফসির ইবনে কাসির: ১/৪৭৫) এটিও এক প্রকার প্রতিবাদের উপায়। ফিকহবিদগণ স্ত্রীকে এই অধিকার দিয়েছেন যে, যদি মোহর তাৎক্ষণিকভাবে প্রদেয় হয় এবং স্বামী তা পরিশোধ না করে থাকে, তবে স্বামী মোহর আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রীর জন্য এটি জায়েজ যে, সে নিজেকে স্বামীর আয়ত্তাধীন করবে না এবং স্বামীর বাড়িতে যাবে না। এরপরও স্বামীর পক্ষ থেকে ভরণপোষণের অধিকার বহাল থাকবে। এটিও প্রতিবাদেরই একটি রূপ।
আজকাল প্রতিবাদের অধিকাংশ রূপই এমন যা একই সাথে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং জাতীয় ও সামষ্টিক ক্ষতির কারণ হয়। যেমন ধরুন, যানবাহনের ধর্মঘট। ইউনিয়ন ধর্মঘটের ডাক দেয়; কিন্তু এতে যেসব ড্রাইভার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন, সাধারণত তাদের জীবন অত্যন্ত স্বল্প আয়ের ওপর নির্ভরশীল। খোদ তাদের ঘরেই না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়; অথচ সামষ্টিক সিদ্ধান্তের কারণে তারা এর বিরোধিতা করতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, ক্ষতি হয় কৃষক ও শিল্পপতিদের। পণ্যের উৎপাদন চলতে থাকে, কিন্তু এর সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ থাকে। কিছু কৃষি পণ্য তো এমন হয় যে পচতে শুরু করে এবং একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। আর উভয়ের চেয়েও বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের; কারণ বাজারে চাহিদা বেড়ে যায় এবং পণ্যের সরবরাহ কমে যায়। ফলে দাম ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, দুই টাকার জিনিস শত টাকায় বিক্রি হয় এবং মানুষ তা কিনতে বাধ্য হয়।
ইসলামের বাণিজ্য ব্যবস্থায় এই বিষয়টির প্রতি পূর্ণ লক্ষ্য রাখা হয়েছে যেন মূল্যের ভারসাম্য নষ্ট না হয়। এই কারণেই ‘ইহতিকার’ বা মজুদদারি থেকে নিষেধ করা হয়েছে। ইহতিকারের অর্থ হলো পণ্য আটকে রাখা, অর্থাৎ কোনো ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিজের কাছে রেখে দেবে, বাজারে আনবে না; যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা যায়। এর ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দুই টাকার জিনিস চড়া দামে বিক্রি হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পদ্ধতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং শক্তভাবে নিষেধ করেছেন। একইভাবে আমাদের সমাজে প্রতিবাদের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে উভয় দিক থেকেই কষ্টদায়ক। প্রতিবাদকারীরা প্রথমত অযৌক্তিক দাবিগুলোর ওপর অনড় থাকে, দ্বিতীয়ত প্রতিবাদের জন্য কষ্টদায়ক ও সামষ্টিক পর্যায়ে বিশৃঙ্খল কর্মপন্থা অবলম্বন করে। অন্যদিকে সরকারের আচরণও বোধগম্য হয় না। শেষ পর্যন্ত সরকার আপস করে ‘দাও ও নাও’ নীতির ভিত্তিতে বিষয়গুলোর সমাধান করে; কিন্তু তা হয় ‘অনেক অনর্থ ঘটার পর’। এভাবে খোদ সরকারও সাধারণ মানুষকে ক্ষতি ও কষ্টের মুখে ফেলার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের মূলনীতি হলো—ক্ষতি যথাসম্ভব দূর করা। পাশাপাশি ইসলামের দৃষ্টিতে একজন ব্যক্তির ক্ষতির তুলনায় একটি দল বা শ্রেণির ক্ষতির চেয়ে গোটা সমাজের ক্ষতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং তা অধিকতর লক্ষণীয়। প্রতিবাদ একটি ন্যায্য অধিকার; কিন্তু শর্ত হলো এর কিছু নির্দিষ্ট সীমা ও নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত, যেন তা এমন এক হিংস্র দানবে পরিণত না হয় যা সাধারণ মানুষকে গ্রাস করে ফেলে এবং জাতি ও দেশকে সামষ্টিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়!
লেখক: ভারতের প্রখ্যাত ফকিহ, সভাপতি: অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল বোর্ড
[উর্দু থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন: সাইমুম রিদা]