নিজস্ব প্রতিবেদক:
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'বিশ্ব সংকট মোকাবেলায় উলামায়ে কেরামের করণীয়' শীর্ষক আলোচনা সভায় ভারতের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব, দাওয়াতি কর্মপদ্ধতি এবং ব্যক্তিগত গুণাবলি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
বুধবার (২২ জুলাই) রাতে রাজধানীর আস-সুন্নাহ মসজিদ কমপ্লেক্সে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের বহুমাত্রিক সংকট মোকাবেলায় উলামায়ে কেরামকে নববী আদর্শ অনুসরণ করে মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে হতাশা নয়, ধৈর্য, প্রজ্ঞা, দরদ এবং বাস্তবতাবোধের সমন্বয় ঘটানো অপরিহার্য।
আল্লামা নোমানী বলেন, একজন দাঈর দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। দাওয়াতের ফলাফল আল্লাহর হাতে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের মতো উদ্ধত শাসকের ব্যাপারেও আশা প্রকাশ করে মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে বলেছিলেন- ‘হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সূরা ত্বহা: ৪৪)

তিনি বলেন, একজন আলেম ও দাঈর মূল পরিচয় হওয়া উচিত মানুষের প্রকৃত কল্যাণকামী হিসেবে। নবীগণের আদর্শ অনুসরণ করে মানুষের হেদায়েত ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি কোরআনের আয়াত উল্লেখ করেন, ‘আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বার্তাসমূহ পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত কল্যাণকামী।” (সূরা আল-আ'রাফ: ৬৮)
বিখ্যাত এই আলেম বলেন, কঠোরতা নয়; প্রজ্ঞা, নম্রতা ও আন্তরিকতাই দাওয়াতের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন— ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলো।’ (সূরা ত্বহা: ৪৪)
আল্লামা নোমানী বলেন, সমাজের মানুষের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের আয়োজন, উপকারী প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণ, এমনকি ফুটবল বা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের মতো আয়োজনও দাওয়াতি কাজের সহায়ক হতে পারে, যদি উদ্দেশ্য হয় মানুষকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা।
তিনি বলেন, কেউ কোনো প্রশ্ন করলে তাকে ইসলামবিদ্বেষী মনে করা উচিত নয়। বরং ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। এক নারী হায়েজ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করলে আয়েশা (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি হারূরিয়্যাহ?’ (সহীহ মুসলিম: ৩৩৫)
তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রশ্ন করা মানেই বিদ্বেষ নয়; অনেক সময় তা জ্ঞানার্জনের আন্তরিক আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ।
আলোচনায় আল্লামা নোমানী একজন আলেম ও দাঈর জন্য কয়েকটি মৌলিক গুণাবলির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সর্বপ্রথম অন্তরকে হিংসা (হাসাদ) ও অহংকার (তাকাব্বুর) থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তাঁর ভাষায়, আলেমসমাজের সবচেয়ে ক্ষতিকর দুটি ব্যাধি হলো হাসাদ ও তাকাব্বুর। ইবলিসের পতনের মূল কারণ ছিল অহংকার। সে বলেছিল, ‘আমি তার (আদমের) চেয়ে উত্তম।’ (সূরা সোয়াদ: ৭৬) তিনি আরও বলেন, আলেমদের আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হতে হবে এবং মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চলতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি শরয়ি জ্ঞানের পাশাপাশি সময়, সমাজ ও বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, শুধু দীনদার হওয়াই যথেষ্ট নয়; সমঝদারও হতে হবে। এ জন্য প্রজ্ঞাবান ও অভিজ্ঞ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আল্লামা নোমানী বলেন, কোনো আলেমেরই নিজেকে জান্নাতের ঠিকাদার মনে করা উচিত নয়। মানুষের চূড়ান্ত পরিণতির ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। তাই বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা এবং আত্মসমালোচনার মনোভাব বজায় রাখতে হবে।
আলোচনার শেষাংশে তিনি উম্মাহর ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সবাইকে নিজের ধারা বা কর্মপদ্ধতিতে আনতে চাওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। মানুষের স্বভাব, মেজাজ ও কর্মপদ্ধতিতে বৈচিত্র্য থাকবেই। কেবল আলেমসমাজ নয়, বরং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং বিভিন্ন যোগ্যতা ও মেজাজের মানুষের সমন্বয়েই একটি শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ উম্মাহ গড়ে ওঠে।
