আন্তর্জাতিক ডেস্ক—
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড। সংগঠনটির কার্যনির্বাহী পরিষদের সোমবারের (২২ জুন) বৈঠকে মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মসজিদ-মাদরাসা সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন রাজ্যে গৃহীত নীতিমালা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
বৈঠকে বলা হয়, বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণপিটুনি, মসজিদ ও মাদরাসা উচ্ছেদ, বসতবাড়িতে বুলডোজার অভিযান এবং ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বোর্ডের মতে, এসব কর্মকাণ্ড দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
কার্যনির্বাহী পরিষদ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে একটি বিস্তারিত তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বোর্ডের নেতারা বলেন, এটি কেবল মুসলমানদের সমস্যা নয়; বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, সামাজিক সম্প্রীতি এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
মধ্যপ্রদেশের কামাল মওলা মসজিদ-ভোজশালা মামলায় উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বোর্ডের দাবি, রায়টি ঐতিহাসিক দলিল, সরকারি নথি এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে চলমান আইনি লড়াইয়ে মসজিদ কমিটিকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বিভিন্ন রাজ্যে ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগেরও সমালোচনা করা হয়। বোর্ডের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো বিষয় শিক্ষার্থী বা নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংবিধানপ্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে স্কুল ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাদরাসাগুলোতে ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে মাদরাসাগুলোতে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার সরকারি নির্দেশনার ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ায় কলকাতা উচ্চ আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশকে স্বাগত জানিয়েছে বোর্ড। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর কিছু অংশ মুসলমানদের তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এটি পাঠ করা ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড) বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বোর্ডের ভাষ্য, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ভারতের বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামোর পরিপন্থী। উত্তরাখণ্ডে এ-সংক্রান্ত আইনের বিরুদ্ধে আদালতে করা মামলার মতো অন্যান্য রাজ্যেও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
এ ছাড়া মুসলমানদের অধিকার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং সংবিধানসম্মত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ কর্মপরিষদ গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বোর্ডের সভাপতি মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রাহমানির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ফজলুর রহিম মুজাদ্দেদি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। বৈঠকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বোর্ডের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, আলেম, আইনজীবী ও সমাজনেতারা অংশগ্রহণ করেন। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের সিদ্ধান্তসমূহ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
আইও