বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬ ।। ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :

কওমি মাদরাসার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ কোথায়


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার || 

বাংলার গ্রামাঞ্চলে ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন সেই সুরের সঙ্গে জেগে ওঠে হাজারো কওমি মাদরাসা। কোথাও একজন শিক্ষক হাতে পুরোনো কিতাব নিয়ে পাঠের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কোথাও ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে ক্লাসরুমে প্রবেশ করছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মাদরাসাগুলো কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও ইসলামি মূল্যবোধের বাতিঘর হিসেবেও সমাজকে আলোকিত করে আসছে।

কিন্তু এই আলোর পেছনে একটি নীরব সংগ্রামের গল্পও রয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো লাখো শিক্ষার্থীর শিক্ষা, আবাসন ও জীবনগঠনের দায়িত্ব বহন করছে, তাদের অনেকেই আজ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ইসলামি গণমাধ্যম, বিশেষ করে আওয়ার ইসলামসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে কওমি মাদরাসাগুলোর আর্থিক সংকট নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। করোনাকালের অভিঘাত, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ফলে যাকাত, ফিতরা, লিল্লাহ ফান্ড ও ব্যক্তিগত অনুদানের পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রেই কমে এসেছে। ফলে বহু মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, শিক্ষার্থীদের খাবার ও আবাসনের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, একটি জাতির নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠান বহন করে, তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সেই সংকট একসময় পুরো সমাজের ওপরই প্রভাব ফেলে।

অনুদান কি একমাত্র পথ?

ইসলামের ইতিহাস আমাদের ভিন্ন এক শিক্ষা দেয়। মহানবী (সা.)-এর সাহাবায়ে কেরামের বড় একটি অংশ ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ইমাম আবু হানিফা নিজেও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁরা কখনো জ্ঞানচর্চাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিপরীত হিসেবে দেখেননি; বরং আত্মমর্যাদাপূর্ণ স্বাবলম্বিতাকে ইসলামী জীবনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

তাই আজ প্রশ্ন উঠছে—কওমি মাদরাসাগুলো কি শুধু অনুদাননির্ভর ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলবে?

ওয়াকফ সম্পদ: অব্যবহৃত সম্ভাবনার ভাণ্ডার

দেশের বহু মাদরাসার অধীনে ওয়াকফকৃত জমি, পুকুর এবং অন্যান্য সম্পদ রয়েছে। কিন্তু এসব সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। কোথাও জমি পতিত পড়ে আছে, কোথাও ব্যবস্থাপনার অভাবে সম্পদ কাঙ্ক্ষিত আয় দিতে পারছে না।

অথচ আধুনিক কৃষি, ফলচাষ, মৎস্যচাষ, দুগ্ধ খামার কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে এসব সম্পদকে উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। এতে একদিকে মাদরাসাগুলোর স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কৃষি ও মাদরাসা: এক নতুন সমন্বয়ের সুযোগ

বাংলাদেশের অধিকাংশ কওমি মাদরাসা গ্রামীণ অঞ্চলে অবস্থিত। তাদের চারপাশে রয়েছে কৃষক, খামারি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী।

কৃষকরা প্রায়ই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, আবার ভোক্তারাও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পণ্য খুঁজে বেড়ান। এই দুই প্রান্তের মধ্যে একটি বিশ্বাসভিত্তিক সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে মাদরাসাগুলো।

কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণনে সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে উঠলে তা শুধু মাদরাসার আয়ই বাড়াবে না; বরং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখবে।

আমি নিজেও ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে কৃষক, খামারি ও ভোক্তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি—মানুষ এখন নিরাপদ খাদ্য ও বিশ্বস্ত উৎসের প্রতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আগ্রহী। এই বাস্তবতা নতুন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করেছে।

হালাল অর্থনীতির বিস্তৃত দিগন্ত

বিশ্বব্যাপী হালাল অর্থনীতির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য, অর্গানিক পণ্য, ইসলামী প্রকাশনা, পোশাক, মধু, মসলা কিংবা অন্যান্য হালাল পণ্যের বাজারে মানুষের আস্থা এখন একটি বড় সম্পদ।

কওমি মাদরাসাগুলো যদি সততা, স্বচ্ছতা ও ইসলামী মূল্যবোধকে ভিত্তি করে সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারে, তবে তারা শুধু নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তিই শক্তিশালী করবে না; বরং দেশের হালাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারেও পরিণত হতে পারবে।

এখানে লক্ষ্য বাণিজ্য নয়; লক্ষ্য হলো আত্মমর্যাদাপূর্ণ স্বাবলম্বিতা।

নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন দিগন্ত

বর্তমানে অনেক মাদরাসায় সাধারণ শিক্ষা ও ব্যবসায় শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি হিসাববিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোক্তা দক্ষতার সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছে।

এই তরুণদের সামনে যদি সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে তারা শুধু চাকরিপ্রত্যাশী হয়ে উঠবে না; বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথিকৃৎ হতে পারবে।

সময়ের দাবি

কওমি মাদরাসাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন এমন একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে দ্বীনি শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ব এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা একসঙ্গে বিকশিত হবে।

দান-সদকার সংস্কৃতি ইসলামি সমাজের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের পাশাপাশি আত্মনির্ভরতার চর্চাও ইসলামেরই শিক্ষা। যে হাত আজ সাহায্য গ্রহণ করছে, পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে আগামীকাল সেই হাত সমাজকে কর্মসংস্থান দিতে পারে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের স্বপ্ন।

কওমি মাদরাসার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন আসলে শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়। এটি শিক্ষা, মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি আমরা নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পারি, তবে কওমি মাদরাসাগুলো কেবল দ্বীনি শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং নৈতিকতা, সামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনীতিরও অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠতে পারে।

কারণ যে প্রতিষ্ঠান মানুষের হৃদয় গড়ে, তার নিজের ভিত্তিও হতে হবে দৃঢ়। আর যে জাতি জ্ঞান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তার অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখা কোনোদিনই সম্ভব নয়।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ