|| শরিফ হাসানাত ||
পৃথিবীর হায়াত একদিন ফুরিয়ে যাবে। পরিসমাপ্তি ঘটবে। এর পর শুরু হবে এমন একদিনের, যার দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। সেদিন মানুষ দিশেহারা হবে। সূর্য চলে আসবে মাথার একেবারে কাছ। তপ্ত উত্তাপে মানুষ ডুবে যাবে ঘামে। কেউ গোড়ালি, কেউ কোমর, কেউ হাঁটু, কেউ মুখ পর্যন্ত ডুবে যাবে। সেদিন কোনো বৃক্ষছায়া থাকবে না। থাকবে না কোনো ভবনছাদ। মানুষ দিকবেদ্বিক হয়ে ছুটতে থাকবে। সেদিন ক্ষমতা বা সম্পদ কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। কেবল থাকবে মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর ছায়া। সেই ভয়াবহ দিনে কিছু সৌভাগ্যবান মানুষকে আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ ছায়ায় আশ্রয় দেবেন—যে ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; উপকারে আসবে শুধু সে, যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে।”(সূরা আশ-শুআরা, ২৬:৮৮–৮৯)
এই সুসংবাদটি দিয়েছেন রাসুল (সা.) একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে। তিনি বলেছেন, “সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।”(বুখারি, হাদিস: ৬৬০; মুসলিম, হাদিস: ১০৩১)
চলুন এই নিবন্ধে জেনে নিই, এই সাত শ্রেণির মানুষ কারা?
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক
ক্ষমতা মানুষকে ঔদ্ধত্য ও অহংকারী করে তোলে। যে ব্যক্তি ক্ষমতার আসনে আসিন হয়ে ন্যায়বিচার কায়েম করে, মানুষের অধিকার রক্ষা করে এবং আল্লাহ তাআলার ভয়ে সিদ্ধন্ত নেয়, সে হাশরের দিন বিশেষ সম্মানে ভূষিত হবে। এখানে রাষ্ট্রপ্রধানই নয়, পরিবারের কর্তা, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল, বিচারক কিংবা যে-ই নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন, সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হাদিসের এই শিক্ষা।
হাদিসে প্রথমেই রাসুল (সা.) বলেছেন, “ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী শাসক।”
কুরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচারের নির্দেশ দেন।”(সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)
২. যে যুবক বেড়ে ওঠে আল্লাহর ইবাদতে
যৌবন মহান আল্লাহর অপার নেয়ামত। আবেগময় সময়। যৌবনের মৌবনে নানা প্রলোভন ও প্রবৃত্তি ঘিরে ধরে। অথচ যে তরুণ যৌবনকে পাপ পঙ্কিলতা থেকে দূরে রাখে, ইবাদত-বন্দেগি, চরিত্রগঠন ও তাকওয়ার রাহে ব্যয় করে মহান আল্লাহ তার জন্য বিশেষ মর্যাদা রেখেছেন।
হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, “এমন এক যুবক, যে শৈশব ও যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে।”
আল্লাহ বলেন, “তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের রবের ওপর ঈমান এনেছিল, আর আমি তাদের হিদায়াত আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।”(সূরা আল-কাহফ, ১৮:১৩)
৩. হৃদয় যার মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত
পৃথিবীতে মসজিদ হলো সবচেয়ে পবিত্র স্থান। ঈমান-আমল, ইলম-তালিম ও আত্মশুদ্ধির কেন্দ্রস্থল। যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করার জন্য ব্যাকুল থাকে, সুযোগ পেলেই মসজিদমুখী হয়, এবং মসজিদের সঙ্গে আত্মিকসম্পর্ক গড়ে তোলে, সে আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ অর্জন করবে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “যার অন্তর সর্বদা মসজিদের দিকে আকৃষ্ট থাকে।”
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর মসজিদগুলো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে।”(সূরা আত-তাওবা, ৯:১৮)
৪. আল্লাহর জন্য যারা একে অপরকে ভালোবাসে
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে গড়ে উঠা বন্ধুত্ব পবিত্র সম্পর্কগুলোর একটি। যে সম্পর্কে স্বর্থ, রাজনীতি বা ব্যক্তিগত লাভের কোনো অভিপ্রায় থাকে না। যারা আল্লাহর জন্য মিলিত হয় এবং আল্লাহর জন্যই বিচ্ছিন্ন হয়, তাদের এই ভালোবাসা কিয়ামতের দিনও উপকারে আসবে।
হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ”এমন দুই ব্যক্তি, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে; আল্লাহর জন্যই একত্রিত হয় এবং আল্লাহর জন্যই পৃথক হয়।”
আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই।”(সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১০)
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা বলবেন, আজ আমি আমার ছায়ায় স্থান দেব তাদের, যারা আমার সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছিল।”(মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৬)
৫. ব্যভিচারের আহ্বান প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি
সুন্দরী ও প্রভাবশালী নারীর আহ্বান প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি আত্মসংযমের সর্বোচ্চ উপামা। গোনাহ করার সকল দ্বার উন্মুক্ত তবু যে বলে, “আমি আল্লাহকে ভয় করি”। এটি প্রকৃত তাকওয়ার পরিচয়। এমন আত্মসংযম আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো মর্যাদাসম্পন্ন ও রূপসী নারী (অবৈধ সম্পর্কে) আহ্বান করলে সে বলে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।”
আল্লাহ আআলা বলেন, “তিনি বললেন, আল্লাহর আশ্রয় চাই।”(সূরা ইউসুফ, ১২:২৩)
৬. গোপনে দানকারী ব্যক্তি
লোকদেখানো দানকে ইসলাম উৎসাহিত করে না। এভাবে দান করবে যেন “ডান হাত যা দেয়, বাম হাতও তা জানতে পারে না”-এটি ইলাসের সর্বোচ্চ নিদর্শন। যে ব্যক্তি মানুষের বাহ্ বাহ্ কিং প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করে না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি জন্যই করে, তবে তার দানই আখিরাতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “এমন ব্যক্তি, যে এত গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কী দান করল, বাম হাতও তা জানতে পারে না।”
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যদি তোমরা গোপনে দান কর, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭১)
৭. নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত হয় যার চোখ
একান্ত নির্জনে যখন আল্লাহর ভয়, ভালোবাসা কিংবা নিজের পাপের কথা স্মরণ করে যার চোখ ভিজে ওঠে, সেই চোখের পানি আল্লাহর কাছে অমূল্য। আর এটিই প্রমাণ বহন করে বান্দার ঈমানের গভীরতা।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “এবং এমন ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, ফলে তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়।”
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তারা চিবুকের ওপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে।”(সূরা আল-ইসরা, ১৭:১০৯)
রাসুলুল্লাহ আরও বলেছেন, “আল্লাহর ভয়ে যে চোখ অশ্রু ঝরায়, সেই চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।”(তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৯)
এই সাতজনই কি কেবল আরশের ছায়া পাবেন?
হাদিসে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত সাত শ্রেণির কথা বলা হয়েছে। তবে অন্যান্য হাদিসে আরও কিছু ব্যক্তির জন্যও কিয়ামতের দিন বিশেষ নিরাপত্তা ও সম্মানের সুসংবাদ এসেছে। যেমন—ঋণগ্রস্তকে অবকাশদানকারী (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৬), ন্যায়পরায়ণ ব্যবসায়ী, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী, মুয়াজ্জিন প্রমুখ।
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন,“বিভিন্ন হাদিস একত্র করলে দেখা যায়, আরশের ছায়া লাভকারীদের সংখ্যা সাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশেষভাবে উল্লেখিত সাতটি শ্রেণি, এর সঙ্গে আরও অনেকে যুক্ত হবেন।”(ফাতহুল বারী, ২/১৪৪)
হাশরের ময়দান হবে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। সেদিন মানুষ নিজের আমল ছাড়া আর কোনো অবলম্বন ও সম্বল থাকবে না। যারা দুনিয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে, যৌবনকে ইবাদতে ব্যয় করেছে, মসজিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, আল্লাহর জন্য ভালোবেসেছে, গুনাহের সুযোগ পেয়েও আল্লাহকে ভয় করেছে, গোপনে দান করেছে এবং নির্জনে আল্লাহর স্মরণে অশ্রু ঝরিয়েছে—তাদের জন্য রয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার: আল্লাহর আরশের ছায়া। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত জীবনের পরতে পরতে এই গুণগুলো অর্জনের চেষ্টা করা, যাতে সেই মহাসমাবেশের দিনে তিনি আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে স্থান লাভ করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সেই সৌভাগ্য দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও কবি
এসএইচ/