শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ।। ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৮


বাড়িভাড়া দেওয়া-নেওয়ায় শরিয়তের বিধান 

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| আরশান আমির || 

বাসস্থান মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। জীবিকা ও নানা প্রয়োজনে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি, ফ্ল্যাট ও দোকান ভাড়া নেওয়ার প্রচলনও বেড়েছে। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো বাড়িভাড়া দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রেও ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এসব বিধান মেনে চললে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয় পক্ষই অন্যায়, বিরোধ ও আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবেন।

ভাড়ার চুক্তি ও শর্তাবলি

ইসলামে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো।’  (সূরা মায়িদা, আয়াত ১) 

এ আয়াতের আলোকে বাড়িভাড়ার চুক্তিতে ভাড়া, পরিশোধের সময়, ইউটিলিটি বিল, সার্ভিস চার্জ এবং বাড়ি ছাড়ার নিয়ম স্পষ্ট করে নেওয়া উচিত। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কোনো শর্ত বা বাড়ির এমন কোনো অসুবিধা গোপন করা উচিত নয়, যা জানলে ভাড়াটিয়া চুক্তিতে সম্মত হতেন না।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।’ (সূরা নিসা, আয়াত ২৯) 

তাই ভাড়া ও অন্যান্য খরচের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং কোনো পক্ষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ আদায় করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার দায়িত্ব

বাড়িওয়ালার দায়িত্ব হলো বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ভাড়াটিয়াকে অবহিত করা এবং চুক্তি অনুযায়ী বাড়ি ব্যবহারের উপযোগী রাখা। অন্যদিকে, ভাড়াটিয়ার দায়িত্ব হলো বাড়িকে আমানত মনে করে যত্নসহকারে ব্যবহার করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, 

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৫৮) 

সুতরাং ভাড়াটিয়া অবহেলা বা সীমালঙ্ঘনের কারণে কোনো জিনিস নষ্ট করলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে স্বাভাবিক ব্যবহারে কোনো কিছু নষ্ট হলে তার মেরামতের দায়িত্ব চুক্তি ও প্রযোজ্য শরয়ি বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে; সব ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার ওপর দায় চাপানো যাবে না।

সিকিউরিটি মানির বিধান

বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে অগ্রিম ভাড়া ও ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি মানি এক বিষয় নয়। অগ্রিম অর্থ শেষের এক বা একাধিক মাসের ভাড়া হিসেবে নির্ধারিত হলে তা অগ্রিম ভাড়া হিসেবে গণ্য হবে। আর বাড়ি ছাড়ার সময় ফেরত দেওয়ার শর্তে অর্থ নেওয়া হলে তার শরয়ি বিধান চুক্তির প্রকৃতি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি মানি বন্ধক হিসেবে গণ্য হলে তা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করার আগে শরয়ি বিধান জেনে নেওয়া জরুরি। কারণ, বন্ধকী সম্পদ থেকে অন্যায়ভাবে সুবিধা গ্রহণ করা বৈধ নয়।

বন্ধকী বাড়ি থেকে বিনা ভাড়ায় সুবিধা গ্রহণ

কেউ কাউকে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে তার বাড়িতে বিনা ভাড়ায় বসবাসের সুযোগ নিলে কিংবা বাড়িটি অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে লাভ গ্রহণ করলে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, ঋণের বিনিময়ে শর্তযুক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ শরিয়তসম্মত নয়।

এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি তাঁর কাছে একটি বন্ধকী ঘোড়ায় আরোহণ করার কথা জানালে তিনি বলেন, 

مَا أَصَبْتَ مِنْ ظَهْرِهَا فَهُوَ رِبًا

‘তার পিঠ থেকে তুমি যে উপকার গ্রহণ করেছ, তা সুদ।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, বর্ণনা ১৮০৭১) 

এ ছাড়া ফাযালা ইবনে উবাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি উক্তিতে এসেছে, 

كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً فَهُوَ وَجْهٌ مِنْ وُجُوهِ الرِّبَا

‘যে ঋণ কোনো সুবিধা বয়ে আনে, তা সুদের বিভিন্ন প্রকারের একটি।’ (সুনানে কুবরা, ইমাম বায়হাকি, হাদিস ১০৯৩৩) 

এখানে উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বর্ণনাটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সরাসরি হাদিস হিসেবে নয়, বরং ফাযালা ইবনে উবাইদ (রা.)-এর উক্তি হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। এর সনদ ও ফিকহি প্রয়োগ সম্পর্কে আলেমদের আলোচনা রয়েছে।

সাবলেট, ভাড়া বৃদ্ধি ও চুক্তি বাতিল

বাড়িওয়ালার অনুমতি ছাড়া ভাড়াকৃত বাড়ি অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। সাবলেটের অনুমতি, ভাড়ার পরিমাণ এবং বাড়িতে কোনো পরিবর্তন আনার বিষয়টি চুক্তিতে স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন।

একইভাবে, চুক্তির মেয়াদ চলাকালে একতরফাভাবে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া বা অযৌক্তিকভাবে চুক্তি বাতিল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভাড়া বৃদ্ধি বা চুক্তির পরিবর্তন হলে তা পারস্পরিক সম্মতি ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হওয়া উচিত।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 

الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ

‘মুসলমানরা তাদের শর্তাবলির ওপর অটল থাকবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস ৩৫৯৪) 

অবশ্য শরিয়তবিরোধী কোনো শর্ত এই সাধারণ নীতির অন্তর্ভুক্ত নয়।

বাড়িভাড়া দেওয়া-নেওয়া কেবল আর্থিক লেনদেন নয়; এর সঙ্গে মানুষের অধিকার, আমানতদারি ও ন্যায়বিচারের বিষয়ও জড়িত। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়ের উচিত চুক্তির শর্ত স্পষ্ট রাখা, অন্যের অধিকার সংরক্ষণ করা এবং কোনো পক্ষের ওপর অন্যায়ভাবে আর্থিক দায় চাপিয়ে না দেওয়া। জটিল কোনো মাসআলা দেখা দিলে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিয়ে লেনদেন সম্পন্ন করাই নিরাপদ।

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ