সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ ।। ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
আল-আযহারের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন চবির দুই অধ্যাপক শাহাদত বার্ষিকীতে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা সামিউল হককে স্মরণ সময়মতো টাকা জমা না দিলে হজের প্রাথমিক নিবন্ধন বাতিল: হাব নারী শিক্ষা প্রশ্নে তালেবানের নীতিকে সমর্থন ডা. জাকির নায়েকের আল-ইবরাহিমি মসজিদ: দুই সহস্র বছরের ইতিহাস, স্থাপত্য ও দখলের ক্ষত এক বছর পর খুলে দেওয়া হলো খিলগাঁও কবরস্থান মসজিদ পোশাকশিল্পের অস্থিরতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিন: খেলাফত মজলিস পবিত্র কাবার ভেতরে নামাজ আদায় করলেন নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে স্বাগত, আমাদের শায়খুল ইসলাম! মুফতি গোলাম মাওলা রহ.-এর স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

আল-ইবরাহিমি মসজিদ: দুই সহস্র বছরের ইতিহাস, স্থাপত্য ও দখলের ক্ষত

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের হেবরনের ঐতিহাসিক মসজিদ আল-ইবরাহিমি শুধু মুসলমানদের ইবাদতস্থল নয়।  এটি নবীদের স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক নিদর্শন, যার দেয়ালে মিশে আছে দুই হাজার বছরের স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও দখলদারির ইতিহাস।

ফিলিস্তিনের হেবরন শহরের পুরোনো অংশে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাথুরে স্থাপনা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে প্রাচীন কোনো দুর্গ। অথচ এর ভেতরেই রয়েছে মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নিদর্শন মসজিদ আল-ইবরাহিমি। এর নিচে অবস্থিত গুহাগুলোকে নবী ইবরাহিম আলাইহিস সালাম, তাঁর স্ত্রী সারাহ, পুত্র নবী ইসহাক আলাইহিস সালাম এবং তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের সমাধিস্থল বলে বিশ্বাস করা হয়।

মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিষ্টান—তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছেই স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে মুসলমানদের কাছে এটি বিশেষভাবে সম্মানিত, কারণ এখানে নবী ইবরাহিম আলাইহিস সালামের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। আরবিতে হেবরন শহরকে বলা হয় ‘আল-খলিল’। এর অর্থ ‘বন্ধু’। নবী ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে বলা হয় ‘খলিলুল্লাহ’—আল্লাহর বন্ধু।

দুই হাজার বছরের স্থাপত্যের সাক্ষী

মসজিদ আল-ইবরাহিমির বর্তমান স্থাপনার ইতিহাস শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে। তখন রোমান শাসক হেরোদ দ্য গ্রেট এখানে একটি বিশাল পাথরের বেষ্টনী নির্মাণ করেন। প্রায় ৬০ মিটার দীর্ঘ ও ৩৪ মিটার প্রশস্ত এই স্থাপনার দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল বিশাল বিশাল চুনাপাথরের ব্লক দিয়ে। কোনো মর্টার ছাড়াই নিখুঁতভাবে বসানো এসব পাথর ছিল প্রাচীন স্থাপত্যকৌশলের বিস্ময়কর নিদর্শন।

দেয়ালগুলোর পুরুত্ব প্রায় আড়াই মিটার। কোনো কোনো পাথরের দৈর্ঘ্য সাত মিটারেরও বেশি। এই নির্মাণশৈলী জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্টের স্থাপত্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। হেরোদীয় স্থাপত্যের এমন অক্ষত নিদর্শন পৃথিবীতে খুবই বিরল।

পরবর্তী সময়ে চতুর্থ শতাব্দীতে এখানে একটি বাইজেন্টাইন গির্জা নির্মিত হয়। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম বিজয়ের পর স্থাপনাটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। যুক্ত করা হয় মিহরাব এবং মুসলমানদের ইবাদতের উপযোগী বিভিন্ন ব্যবস্থা। এভাবেই মসজিদ আল-ইবরাহিমি মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ জিয়ারতস্থানে পরিণত হয়।

ক্রুসেড থেকে সালাহউদ্দিনের পুনরুদ্ধার

১১০০ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডাররা হেবরন দখল করে মসজিদটিকে গির্জায় রূপান্তরিত করে। তারা এর নাম দেয় ‘ক্যাসল অব সেন্ট আব্রাহাম’। প্রায় ৯০ বছর স্থাপনাটি গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

১১৮৮ সালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি হেবরন পুনরুদ্ধার করলে আবারও মসজিদটির ইসলামী পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এর সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। তাঁর সময় চার কোণে চারটি মিনার নির্মাণ করা হয়, যার দুটি এখনো টিকে আছে। এ সময় মসজিদে স্থাপন করা হয় একটি ঐতিহাসিক কাঠের মিম্বর, যা মূলত ফাতেমীয় যুগে আসকালানের একটি মসজিদের জন্য তৈরি হয়েছিল। একাদশ শতাব্দীর এই মিম্বরটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ইসলামী কাঠশিল্পের অন্যতম মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

মামলুক শাসনে স্থাপত্যের নতুন রূপ

মসজিদ আল-ইবরাহিমির স্থাপত্য বিকাশে মামলুক যুগ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১২৫০ থেকে ১৫১৭ সাল পর্যন্ত এই সময়ে মসজিদটির ব্যাপক সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়।

১৩১৮ থেকে ১৩২০ সালের মধ্যে মামলুক শাসক আমির সানজার আল-জাওয়ালি নির্মাণ করেন মসজিদ আল-জাওয়ালি। এটি মূল মসজিদের সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত যে বাইরে থেকে এর অস্তিত্ব সহজে বোঝা যায় না। এর দেয়ালের একটি অংশ মূল হেরোদীয় স্থাপনার দেয়াল, আর অন্য অংশগুলো সরাসরি পাহাড়ের পাথর কেটে নির্মিত।

মসজিদ আল-জাওয়ালির অভ্যন্তরে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত অংশ, পাথরের স্তম্ভ, ক্রস-ভল্ট এবং তিনটি গম্বুজ। কেন্দ্রীয় গম্বুজের নিচে রয়েছে মুকারনাস অলংকরণ ও মোজাইকযুক্ত জানালা, যার মধ্য দিয়ে আলো প্রবেশ করে নামাজের স্থানকে আলোকিত করে।

১৩৩২ সালে আমির তানকাজ আল-নাসিরি মসজিদের দেয়ালে মার্বেল পাথরের আবরণ যুক্ত করেন। সুলতান বারকুক নির্মাণ করেন একটি মিহরাব। মামলুক শাসকেরা মসজিদের মিনার, দেয়ালের অলংকরণ এবং নবীদের সমাধির ওপর স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৩৯৩-১৩৯৪ সালে আমির শিহাবুদ্দিন আল-ইয়াগমুরি নারীদের নামাজের জন্য আলাদা স্থান নির্মাণ করেন। এটি ‘জামি আল-নিসা’ নামে পরিচিত। 

মসজিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা হেবরন

মসজিদ আল-ইবরাহিমি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়। এটি হেবরন শহরের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নগরজীবনের কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মামলুক যুগে হেবরন মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ জিয়ারতকেন্দ্র ও সুফি সাধকদের আবাসস্থলে পরিণত হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে সুফি খানকাহ বা জাওয়িয়া। দূরদূরান্ত থেকে আগত হাজি, ব্যবসায়ী ও জিয়ারতকারীদের জন্য নির্মিত হয় সরাইখানা, বাজার এবং বিভিন্ন সেবাকেন্দ্র।

মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অবকাঠামো হেবরনকে ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক শহর হিসেবে সমৃদ্ধ করে। জেরুজালেম, সিনাই, জর্ডান ও আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগেও শহরটির গুরুত্ব বাড়ে।

দখল, বিভাজন ও ইবাদতে বাধা

মসজিদ আল-ইবরাহিমির ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় শুরু হয় আধুনিক সময়ে। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল হেবরন দখল করার পর মসজিদে মুসলমানদের প্রবেশ ও ইবাদতের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ধীরে ধীরে মসজিদের কিছু অংশে ইহুদিদের উপাসনার অনুমতি দেওয়া হয়।

১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রমজান মাসে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বারুখ গোল্ডস্টেইন মসজিদে প্রবেশ করে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালায়। এতে ২৯ জন মুসল্লি নিহত হন এবং ১২৫ জনের বেশি আহত হন।

এই হত্যাকাণ্ডের পর মসজিদটিকে বিভক্ত করে ফেলা হয়। শামগার কমিশনের সিদ্ধান্তে এর ৬৩ শতাংশ ইহুদিদের উপাসনার জন্য এবং ৩৭ শতাংশ মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলমানদের ব্যবহৃত মসজিদটি কার্যত সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও বিভাজনের অধীনে চলে যায়।

বর্তমানে মুসল্লিদের মসজিদে প্রবেশ করতে একাধিক সামরিক চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হয়। নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে নামাজের স্থানে পৌঁছাতে হয়। বছরে ১০ দিন এমন ব্যবস্থা করা হয়, যখন উপাসনাস্থলগুলোর ব্যবহার উল্টে দেওয়া হয়। তবে এতে মসজিদের স্থায়ী বিভাজন দূর হয় না।

২০২৫ সালে বিভিন্ন প্রতিবেদনে মসজিদে আজান দিতে বাধা দেওয়ার ৭৬৯টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আজানের ওপর এই বিধিনিষেধ মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার ও মসজিদের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

২০২৬ সালে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর

২০২৬ সালের শুরুতে মসজিদ আল-ইবরাহিমির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। জানুয়ারিতে হেবরন পৌরসভার পরিকল্পনা ও নির্মাণসংক্রান্ত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এসব ক্ষমতা নিকটবর্তী ইসরায়েলি বসতি কিরিয়াত আরবার ধর্মীয় কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফেব্রুয়ারিতে ইসলামী ওয়াকফ ও ফিলিস্তিনের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে ইসরায়েলি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হাতে দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা এসব পদক্ষেপকে মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনগত অবস্থানের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন।

২০২৬ সালের রমজানেও মুসল্লিদের প্রবেশে বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিভিন্ন বাধার অভিযোগ উঠে। মসজিদের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা দেয়াল, ক্যামেরা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা এর ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের লড়াই

২০১৭ সালে ইউনেস্কো হেবরনের পুরোনো শহর ও পিতৃপুরুষদের সমাধিস্থলকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এতে মসজিদ আল-ইবরাহিমির ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও স্থাপত্যগত গুরুত্বের পাশাপাশি এর সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগও তুলে ধরা হয়।

১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হেবরন রিহ্যাবিলিটেশন কমিটি মসজিদ ও পুরোনো শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে কাজ করছে। পাথর, মার্বেল, কাঠ, টাইলস, মোজাইক ও দেয়ালের অলংকরণ পুনরুদ্ধারে বিশেষজ্ঞ তৈরি করা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সংস্কার, দেয়ালের ক্ষতি প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ অলংকরণ পুনরুদ্ধারেও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

২০১৭ সালের সংস্কারকাজে মসজিদের অভ্যন্তরের কিছু প্রাচীন অলংকরণ ও রঙের নিদর্শন নতুন করে উন্মোচিত হয়। তবে ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে বিভিন্ন সময়ে এসব কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

ইতিহাসের দেয়ালে জমে থাকা প্রশ্ন

মসজিদ আল-ইবরাহিমি এমন একটি স্থাপনা, যেখানে একই সঙ্গে প্রাচীন রোমান স্থাপত্য, বাইজেন্টাইন ঐতিহ্য, ক্রুসেডারদের নির্মাণশৈলী এবং ইসলামী স্থাপত্যের বহু শতাব্দীর বিকাশ দৃশ্যমান। এর প্রতিটি দেয়াল, মিনার, গম্বুজ ও মিহরাব বহন করছে ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়।

কিন্তু এই ঐতিহাসিক স্থাপনার বর্তমান বাস্তবতা কেবল স্থাপত্যের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় অধিকার, ঐতিহাসিক পরিচয়, দখলদারি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন।

নবী ইবরাহিম আলাইহিস সালামের স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদ আজও দাঁড়িয়ে আছে হেবরনের পুরোনো শহরে। দুই হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এর পাথুরে দেয়াল যেন নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছে—স্থাপত্য কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়। এটি মানুষের বিশ্বাস, পরিচয় ও ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ