শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮


করপোরেট নেতৃত্বে নববী আদর্শ: কয়েকটি নমুনা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| খালিদ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ ||

০১. রাসুলের (সা.) সিরাত কি আধুনিক করপোরেট জগতে পথনির্দেশক হতে পারে? প্রশ্নটি কেন জরুরি? কারণ করপোরেট নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ যদি ওয়েস্টার্ণ থিওরি এবং সেকুলার তাত্ত্বিকদের বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে সমাধা করতে হয়, তখন কর্মজীবী মানুষের জীবনযাত্রার পাটাতন রূপান্তরিত হয়।

তারা খুঁটিনাটি সংকটের সমাধান সিরাতে তালাশ করেন না, বরং সেক্যুলার লিবারেল বোঝাপড়ায় আটকে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যান। কাজেই প্রথম কথাটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, করপোরেট মানুষের জন্য।

প্রথমেই ধন্যবাদ The Message Academy কে। তাদের আয়োজনে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ৬০+ ইনচার্জ ও দায়িত্বশীলদের সঙ্গে একটি সেশনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে ‘প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে নববী আদর্শ’ ছিল আলাপের শিরোনাম। প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের বিচিত্র বিষয় নিয়ে আলাপ করেছি। সেখান থেকে কয়েকটি পয়েন্ট তুলে ধরছি সংক্ষেপে...

০২.

সিরাত অলৌকিক কাহিনী নয়, বরং একজন বাস্তব মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, قَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِىۡ  رَسُوۡلِ اللّٰهِ اُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ । (সুরা আহযাব)

মোস্তফা সিবাই (রহ.) লিখেছেন, সিরাত নবীজিকে (সা.) অতিমানবীয় বিমূর্ত সত্তা হিসেবে হাজির করে না; বরং মানুষকে আখলাক ও কর্মদক্ষতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর বাস্তব ও অনুকরণীয় রূপ দেখায়।

০৩.

যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বুনিয়াদ গড়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।

নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বেই তৎকালীন মক্কার ব্যবসায়িক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিচিত ছিলেন ‘আল-আমিন’ হিসেবে। আধুনিক লিডারশিপ থিওরিতে যাকে Integrity-based Leadership বলা হয়, সিরাতে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তব রূপ আপনি পাবেন।

০৪.

প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের তত্ত্ব অনুযায়ী ন্যায়ের তিনটি রূপ; বণ্টনমূলক, পদ্ধতিগত এবং পারস্পরিক ন্যায়বিচার। সিরাতে তাকালে আমরা দেখি, বিচার বা সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে নবীজি কখনো স্বজনপ্রীতি বা সামাজিক মর্যাদার তোয়াক্কা করেননি। মখযুম গোত্রের নারীর বিচারের দৃষ্টান্ত কিংবা হুনাইনের যুদ্ধোত্তর সম্পদ বণ্টনের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের প্রয়োগ কতটা সুদৃঢ় ছিল।

০৫.

একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা নয়, বরং পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল নববী নেতৃত্বের অন্যতম মূলনীতি। বদর, উহুদ কিংবা খন্দকের  ‍যুদ্ধে সাহাবিদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা আধুনিক Participative Leadership-এর এক চিরন্তন উদাহরণ।

০৬.

বংশপরিচয় বা সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে দক্ষতাকে মানদণ্ড করে তিনি কাউকে ওহি-লেখক, কাউকে রাষ্ট্রদূত কিংবা কাউকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন। রাসুল সা. সতর্ক করেছেন যে, ‘অযোগ্য লোকের হাতে দায়িত্ব সোপর্দ করা হলে তোমরা কেয়ামতের অপেক্ষা করো’। যা বর্তমানের Strength-Based Delegation এবং Succession Planning -এর মূলকথা।

০৭.

আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানে রবার্ট গ্রিনলিফ প্রবর্তিত Servant Leadership ধারণাটি বেশ প্রশংসিত, যার সারকথা-- নেতা কেবল নির্দেশদাতা নন, বরং দল বা টীমের সেবক।

নবীজি কেবল নির্দেশ দিয়ে দায় সারেননি, বরং নিজে কাজ করে দলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। মসজিদে নববী নির্মাণে পাথর বহন কিংবা খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিক Leading by Example-এর ঐতিহাসিক দলিল।

০৮.

একজন ইনচার্জ বা লিডারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অধস্তনদের আবেগ ও মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গোলম্যান যাকে Emotional Intelligence (EQ) বলছেন, সিরাতে তার প্রয়োগ চোখে পড়ার মতো। অধস্তনদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা না চাপানো, ব্যক্তিগত ভুলগুলো গোপনে সুধরে দেওয়া এবং রাগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত রাখা ছিল নবীজির স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।

তিনি শিখিয়েছেন, ক্ষমতার বলে অন্যকে দমন করা সত্যিকারের শক্তি নয়, বরং রাগের মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রকৃত সক্ষমতা। তাছাড়া, তায়েফের নির্মমতা কিংবা বেদুইনদের অশোভন আচরণের জবাবে তাঁর ক্ষমা ও সহনশীলতা প্রমাণ করে-- প্রকৃত নেতৃত্ব কঠোরতায় নয়, বরং ধৈর্য্যে নিহিত।

০৯. এখানেই নববী নেতৃত্ব-দর্শন প্রচলিত পশ্চিমা করপোরেট মডেল থেকে গুণগতভাবে আলাদা হয়ে যায়। সাধারণ করপোরেট কাঠামো যেখানে কেবল মুনাফা-সর্বোচ্চকরণ (Profit Maximization)-কে লক্ষ্য ধরে, নববী মডেল সেখানে কাজের মাকসাদ বা উদ্দেশ্যকে মূখ্য হিসেবে বিবেচনা করে।

এই ইসলামে পেশাগত দায়িত্ব পালন কেবল জীবনধারণের উপায় নয়, বরং মাকসাদ ঠিক থাকলে সেটি ইবাদতে রূপ নিতে পারে।

এখানে নেতার লক্ষ্য কেবল বৈষয়িক সাফল্য থাকবে না, বরং দুনিয়া-আখিরাতের ফালাহ ও নসিহা (কল্যাণকামিতা) কামনা করবে সে। ফলে দায়বদ্ধতা শুধু ঊর্ধ্বতনের কাছে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি নৈতিক জবাবদিহিতা তৈরি হয়।

১০.

একজন দূরদর্শী নেতা কেবল তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অর্জন করেন না, তিনি ভবিষ্যত নেতৃত্ব তৈরি করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শেখানো, প্রশ্ন করে চিন্তাশক্তি জাগ্রত করা, উপমার মাধ্যমে জটিল বিষয় সহজ করা এবং পরিস্থিতি বুঝে শাসন বা সোহাগ করা-- তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক মেন্টরিংয়ের অনবদ্য পাঠ।

একজন করপোরেট ইনচার্জের মূল দায়িত্বও ঠিক এটিই; কর্মীদের ওপর কেবল কাজ চাপিয়ে না দিয়ে, তাদের দক্ষতার বিকাশ ঘটানো এবং মেধা লালন করা।

আজকের প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞান যা কিছু নতুন পরিভাষায় আবিষ্কার করছে -তা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা হোক, সেবামূলক নেতৃত্ব হোক কিংবা অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ- তার প্রতিটি উপাদানের প্রয়োগ সিরাতে বিদ্যমান।

লেখক: তরুণ আলেম, চিন্তক ও গবেষক

এসএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ