বিশেষ প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনটি দেশের আলেম-উলামার কাছে ব্যাপক পরিচিত। এই আসন থেকে ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন বিশিষ্ট আলেমে দীন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.। এবারের নির্বাচনেও বিএনপি জোট থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন একজন আলেমে দীন। তিনি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। মুফতি আমিনীর একসময়ের সহচর এই আলেম বর্তমানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। হেফাজতে ইসলামেরও প্রভাবশালী নেতা। ওয়ায়েজ হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিত। বিএনপি এবার জমিয়তকে যে চারটি আসনে ছাড় দিয়েছে এর মধ্যে একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।
বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে দলটির সমর্থন পেলে সংসদে যাওয়ার পথ অনেকটাই পরিষ্কার। তাছাড়া আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং জাতীয় পার্টির নিষ্ক্রিয়তায় সেটা আরও ত্বরান্বিত হওয়ার কথা ছিল। তবে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। এর বড় কারণ বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত দলটির কেন্দ্রীয় নেত্রী এবং টক শোর আলোচিত মুখ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এখানে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন। অনেক বছর ধরে আসনটিতে কাজ করে আসা রুমিন ফারহানা শক্তিশালী প্রার্থী। তিনি ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত অনড় থাকলে খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের জন্য সংসদে যাওয়াটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটির অতীত পরিসংখ্যান খুঁজে দেখা গেছে, আসনটি বিএনপির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। এরপর আছে লাঙ্গলের অবস্থান। এখানে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাতটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন ছয়বার, লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী ৯ বার অংশ নিয়ে তিনবার এবং নৌকা প্রতীকের প্রার্থী পাঁচবার অংশ নিয়ে একবার আর স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন দুবার। এ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট তাদের শরিকদের দুবার ছাড় দিয়ে একবার জয়ী হয়েছে। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট তাদের শরিকদের পাঁচবার ছাড় দিয়ে জয় পেয়েছে দুবার।
আসনটি বর্তমানে সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত। এখানে মোট ভোটার চার লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। এর মধ্যে সরাইল উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ভোট আছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬০৯টি, আশুগঞ্জ উপজেলার আটটি ইউনিয়নে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯ ও বিজয়নগর উপজেলার দুটি ইউনিয়নে ভোট আছে ৫৭ হাজার ৭৪০টি।
এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দলীয়ভাবে তিনিই মনোনয়ন পাবেন এমনটা প্রায় নিশ্চিত ছিল। তবে বিএনপির সঙ্গে জমিয়তের নির্বাচনি জোট হওয়ায় সংরক্ষিত আসনের সাবেক এই সদস্য মনোনয়ন বঞ্চিত হন। তবে তিনি এবার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে অনড়। শেষ পর্যন্ত দলীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এবং বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।
রুমিন ফারহানার পৈত্রিক নিবাস এই আসনে। তার বাবা বিখ্যাত রাজনীতিক ও ভাষা সৈনিক অলি আহাদও ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে এই আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছিলেন। অবশেষে রুমিন ফারহানাকেও বাবার পথেই হাঁটতে হলো।
মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের সঙ্গে রুমিন ফারহানার বাগযুদ্ধ ইতোমধ্যে বেশ জমে উঠেছে। জাতীয় রাজনীতিতেও এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। রুমিন ফারহানা তার প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, জুনায়েদ আল হাবীবের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায়। তিনি এখানে বহিরাগত। এজন্য বাইরের কাউকে নির্বাচিত না করতে তিনি এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে বিশিষ্ট ইসলামি বক্তা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবও ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে রুমিন ফারহানা যে তার জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন তৎপরতায়। তিনি ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। রুমিন ফারহানাকে ভোটের মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধও করেছেন।
তবে রুমিন ফারহানা এখন পর্যন্ত ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এবং কোনোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনে তাকে বহিষ্কার করায় তিনি বেশ মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন। এছাড়া তিনি আক্ষেপ করে কবির ভাষায় বলেছেন- ‘যখন তোমার কেউ ছিল না তখন ছিলাম আমি, এখন তোমার সব হয়েছে, পর হয়েছি আমি।’ দল অনুরোধ করলে ভোটের মাঠ থেকে সরবেন কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রুমিন ফারহানা জানিয়েছেন, তিনি এখন আর দলের কেউ না। এজন্য দল এমন অনুরোধ করার অধিকার রাখে না। এছাড়া তিনিও এখন আর সেই অনুরোধ রাখতে বাধ্য নন।
যদিও সূত্রের খবর, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শরিকদের জিতিয়ে আনার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। যেখানে যেখানে সমস্যা আছে সেখানে নিজেই হস্তক্ষেপ করবেন বলে জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিএনপির শরিক জুনায়েদ সাকী এবং আন্দালিব রহমান পার্থের আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিবৃত করেছেন। শেষ পর্যন্ত জুনায়েদ আল হাবীবের প্রতিদ্বন্দ্বী রুমিন ফারহানাকে ভোটর মাঠ থেকে সরাতেও তারেক রহমান উদ্যোগী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য করার অফারও দিতে পারে বিএনপি।
এদিকে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা রুমিন ফারহানারই হবে বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীসহ প্রক্রিয়াধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী করা হচ্ছে এনসিপি নেতা মাওলানা আশরাফ মাহদীকে। তিনি এই আসনের সাবেক এমপি মুফতি আমিনীর দৌহিত্র। তবে ভোটের মাঠে খুব একটা সুবিধা করার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় আলেমদের বড় অংশ মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিয়েছে।
আরএইচ/