শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ।। ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮


মিথ্যা সাক্ষ্য সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ইসলামে অন্যতম ভয়াবহ কবিরা গুনাহ। এর মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষ অন্যায়ের শিকার হয়, মানুষের অধিকার নষ্ট হয় এবং ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ, শত্রুতা কিংবা কাউকে বিপদে ফেলার উদ্দেশ্যে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; বরং এটি সমাজের ন্যায়বিচার ও শান্তি-শৃঙ্খলার জন্যও মারাত্মক হুমকি।

পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে মিথ্যা কথা এবং মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিকবার সাহাবায়ে কেরামকে এ অপরাধের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা মিথ্যা কথা ও মিথ্যা সাক্ষ্য পরিহারের নির্দেশ দিয়ে বলেন,

فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ

‘অতএব, তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যা কথা পরিহার করো।’(সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩০)

এ আয়াতে মূর্তিপূজার অপবিত্রতা বর্জনের নির্দেশের পাশাপাশি মিথ্যা কথা পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতটি মিথ্যা বক্তব্য ও মিথ্যা সাক্ষ্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে।

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আরও বলেন,

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ

‘আর তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না।’(সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭২।

অর্থাৎ, আল্লাহর সৎ বান্দারা মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে দূরে থাকেন। তাঁদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করা।

মিথ্যা সাক্ষ্যকে বড় কবিরা গুনাহ বলেছেন নবীজি (সা.)

হজরত আবু বাকরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন,

أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟

‘আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ সম্পর্কে জানাব না?’

সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল!’

তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।’ এরপর তিনি হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন,

أَلَا وَقَوْلُ الزُّورِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ

‘সাবধান! মিথ্যা কথা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য!’

বর্ণনাকারী বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কথাটি বারবার বলতে থাকলেন। একপর্যায়ে সাহাবিরা মনে মনে কামনা করলেন, তিনি যদি একটু থামতেন! (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৫৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৭)

হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষভাবে সোজা হয়ে বসা এবং বারবার সতর্ক করার বিষয়টি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা সাক্ষ্যের ভয়াবহতা প্রকাশ করে। তাই কোনো ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষা, প্রতিশোধ নেওয়া কিংবা পার্থিব সুবিধা অর্জনের জন্য মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া থেকে প্রত্যেক মুসলমানের বেঁচে থাকা জরুরি।

মিথ্যা সাক্ষ্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে আরও সতর্কবাণী

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) কবিরা গুনাহের উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, অন্যায়ভাবে প্রাণ হত্যা করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্যতার কথা বলেন। এরপর তিনি মিথ্যা কথা বলা অথবা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৫৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৮)

অন্য এক হাদিসে হজরত খুরাইম ইবনে ফাতিক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে শিরকের সঙ্গে তুলনা করে সতর্ক করেছেন। এরপর তিনি সুরা আল-হাজ্জের ৩০ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯৯; জামে তিরমিজি, হাদিস: ২২৯৯)

এসব বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়, মিথ্যা সাক্ষ্য কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এর মাধ্যমে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

মিথ্যা কসম করে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ

মিথ্যা সাক্ষ্যের সঙ্গে মিথ্যা কসমেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোনো ব্যক্তি মিথ্যা কসম করে অন্যের সম্পদ বা অধিকার আত্মসাৎ করলে তার জন্য কঠোর শাস্তির সতর্কবাণী এসেছে।

হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ كَاذِبَةٍ يَقْتَطِعُ بِهَا مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ، لَقِيَ اللَّهَ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ

 ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম করে কোনো মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করে, সে আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ থাকবেন।’(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪৪৫)

এ হাদিসের শিক্ষা হলো, অন্যের সম্পদ ও অধিকার রক্ষায় সত্যের ওপর অবিচল থাকা অপরিহার্য। মিথ্যা সাক্ষ্য বা কসমের মাধ্যমে কারও সম্পদ, জমি কিংবা অন্য কোনো অধিকার কেড়ে নেওয়া গুরুতর জুলুম।

মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার দুনিয়াবি পরিণতি

ইসলামি বিচারব্যবস্থায় সাক্ষীর সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির মিথ্যা সাক্ষ্য প্রমাণিত হলে বিচারক পরিস্থিতি, অপরাধের ধরন এবং প্রযোজ্য শরয়ি বিধান বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে মিথ্যা সাক্ষ্যদাতাকে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত হিসেবে মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ করে মানুষকে তার ব্যাপারে সতর্ক করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর সঙ্গে বেত্রাঘাতের শাস্তিও যুক্ত হতে পারে। (বাদায়েউস সানায়ে, ৬/২৮৯)

এ বিষয়ে রদ্দুল মুহতার গ্রন্থেও মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার শাস্তি, অপরাধে অবিচল থাকা এবং তওবা করার অবস্থার মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এসব শাস্তি প্রয়োগের বিষয়টি বিচারিক কর্তৃপক্ষ ও শরয়ি বিধানের আওতাভুক্ত; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজের উদ্যোগে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই।

মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে তওবা করার উপায়

মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পর কেউ অনুতপ্ত হলে তার জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করা জরুরি। তওবার জন্য অপরাধ পরিত্যাগ করা, নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে এ অপরাধে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা প্রয়োজন।

মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণে কারও সম্পদ, সম্মান বা অন্য কোনো অধিকার ক্ষুণ্ন হয়ে থাকলে সেই অন্যায় সংশোধনের জন্য যথাসাধ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা হলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণে কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত অন্যায়ভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকলে সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সত্য জানিয়ে ক্ষতি সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

শুধু মুখে তওবা করেই অন্যের অধিকার নষ্ট করার বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণ আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি মানুষের হক আদায়ের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মিথ্যা সাক্ষ্য ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। এর মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষ শাস্তি পেতে পারে, প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হতে পারে। এ কারণেই পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সত্য কথা বলা, সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা কারও অনুরোধে সত্য গোপন বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সত্যবাদী হওয়ার এবং সব ধরনের মিথ্যা ও জুলুম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ