সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ ।। ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
মাদরাসায় ৯৫ জনকে নিয়োগ দেবে মারকাজুল ফুরকান শিক্ষার্থীদের মারধর ও মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ করল বেফাক আল-আযহারের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন চবির দুই অধ্যাপক শাহাদত বার্ষিকীতে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা সামিউল হককে স্মরণ সময়মতো টাকা জমা না দিলে হজের প্রাথমিক নিবন্ধন বাতিল: হাব নারী শিক্ষা প্রশ্নে তালেবানের নীতিকে সমর্থন ডা. জাকির নায়েকের আল-ইবরাহিমি মসজিদ: দুই সহস্র বছরের ইতিহাস, স্থাপত্য ও দখলের ক্ষত এক বছর পর খুলে দেওয়া হলো খিলগাঁও কবরস্থান মসজিদ পোশাকশিল্পের অস্থিরতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিন: খেলাফত মজলিস পবিত্র কাবার ভেতরে নামাজ আদায় করলেন নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট

মাহফিলের নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতা: ফিরে আসুক মূল উদ্দেশ্য

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| মুফতি জাবের কাসেমী ||

একসময় মাহফিল ছিল আত্মশুদ্ধির ময়দান, ঈমান জাগ্রত করার আয়োজন, দ্বীনের কথা শোনার এক পবিত্র সমাবেশ। মানুষ মাহফিলে আসত আল্লাহর কথা শুনতে, আখিরাতের চিন্তা জাগাতে, নিজের জীবনকে সংশোধন করতে। বক্তারা আসতেন ইলমের আমানত পৌঁছে দিতে, মানুষকে হেদায়েতের পথে আহ্বান করতে।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ অনেক মাহফিল তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাচ্ছে। মাহফিলের নামে কোথাও চলছে বক্তাদের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা, কোথাও আয়োজনের জৌলুস প্রদর্শন, কোথাও আবার একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

মাহফিল নষ্ট করছে যেসব বক্তারা

যাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পারিশ্রমিক, জনপ্রিয়তা, ভিউ, ভাইরাল হওয়া ও শ্রোতাদের হাততালি। বক্তব্যে ইলম, আমল, আখলাক ও আত্মশুদ্ধির চেয়ে বিনোদন, চমক, অপ্রাসঙ্গিক গল্প এবং উত্তেজনাকর কথাবার্তার প্রাধান্য বাড়ছে। কেউ কেউ শ্রোতাদের আবেগকে পুঁজি করে নিজের জনপ্রিয়তা ও বাজারমূল্য বাড়াতে ব্যস্ত।

বক্তাদের নষ্ট করছে আয়োজকরা

অনেক আয়োজক এখন যোগ্যতা, ইলম, তাকওয়া ও বক্তব্যের উপকারিতার চেয়ে বক্তার জনপ্রিয়তা, শ্রোতা টানার ক্ষমতা এবং নামের বাজারদরকে বেশি গুরুত্ব দেন। কে কত বেশি মানুষ জমাতে পারবেন, কার মাহফিলে কত বেশি ভিড় হবে, কার পোস্টার কত আকর্ষণীয় হবে এসবই যেন আয়োজনের সাফল্যের মাপকাঠি।

ফলে প্রকৃত আলেম ও উপকারী আলোচনার চেয়ে জনপ্রিয় বক্তাদের কদর বাড়ছে।

আয়োজকদের নষ্ট করছে কুপ্রবৃত্তির চাহিদা

তাদের হিংসা, লৌকিকতা ও আয়োজনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এক মাহফিলের সঙ্গে আরেক মাহফিলের তুলনা, এক কমিটির সঙ্গে অন্য কমিটির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কে কত বড় মঞ্চ বানাল, কে কত নামিদামি বক্তা আনল, কার মাহফিলে কত মানুষ হলো, কে কত টাকা খরচ করল এসব নিয়ে চলে অঘোষিত প্রতিযোগিতা।

দ্বীনের খেদমতের জায়গায় কখনো ব্যক্তিগত অহংকার, দলীয় প্রভাব ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রবণতা জায়গা করে নেয়।

অথচ মাহফিলের সৌন্দর্য মঞ্চের বিশালতায় নয়, বরং সেখানে উচ্চারিত কথার সত্যতায়। মাহফিলের সফলতা মানুষের সংখ্যায় নয়, বরং কতজন মানুষের জীবনে পরিবর্তন এলো, কতজন গুনাহ ছেড়ে তাওবার পথে ফিরল, কতজনের অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি হলো তার মধ্যে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মাহফিল কোনো বিনোদনকেন্দ্র নয়, বক্তাদের বাজার নয়, আয়োজকদের সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মঞ্চও নয়। এটি দ্বীনের দাওয়াত, নসিহত ও আত্মগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তাই বক্তাদের উচিত ইলম, ইখলাস ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কথা বলা। আয়োজকদের উচিত যোগ্য ও উপকারী বক্তা নির্বাচন করা, অযথা প্রতিযোগিতা পরিহার করা এবং মাহফিলের অর্থ ও আয়োজনকে আমানত মনে করা। আর শ্রোতাদেরও উচিত চটকদার বক্তব্যের পরিবর্তে উপকারী আলোচনা ও আমলের আহ্বানকে গুরুত্ব দেওয়া।

মাহফিলের মঞ্চ বড় করার আগে নিয়ত বড় করতে হবে। বক্তার নাম বড় করার আগে বক্তব্যের মান বাড়াতে হবে। মানুষের ভিড় বাড়ানোর আগে মানুষের জীবনে দ্বীনের প্রভাব বাড়ানোর চিন্তা করতে হবে।

আমরা এমন মাহফিল চাই, যেখানে বক্তা জনপ্রিয়তার জন্য নয়, হেদায়েতের জন্য কথা বলবেন; আয়োজক প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আয়োজন করবেন; আর শ্রোতা বিনোদনের জন্য নয়, নিজের জীবন পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মাহফিলে আসবেন।

আল্লাহ আমাদের মাহফিলগুলোকে লৌকিকতা, অহংকার, হিংসা ও ব্যবসায়িক মানসিকতা থেকে মুক্ত করে ইখলাস, ইলম, আমল ও হেদায়েতের ময়দানে পরিণত করুন। আমিন।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ