নিজস্ব প্রতিবেদক
কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত একমুখী প্রচারণা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। একই সঙ্গে অভিযোগ যাচাই, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তদারকির জন্য একটি কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণে একটি হটলাইন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানী ঢাকায় আল-হাইআতুল উলয়ার কার্যালয়ে ‘কওমি মাদরাসা বিরোধী অপপ্রচার রোধ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আল-হাইআতুল উলয়ার করণীয়’ শীর্ষক সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশক্রমে অনুষ্ঠিত সভায় সংগঠনটির অধীন ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে সভাপতিত্ব করেন আল-হাইআতুল উলয়ার কো-চেয়ারম্যান ও বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি আল্লামা শেখ সাজিদুর রহমান।
সভায় বক্তারা বলেন, কোনো অপরাধ, অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তার সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গণমাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা, লক্ষাধিক শিক্ষক এবং লাখো শিক্ষার্থীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
সভায় আরও বলা হয়, ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক চরিত্র গঠন ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে কওমি মাদরাসার দীর্ঘদিনের অবদান রয়েছে। অথচ কিছু অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় সমগ্র কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সভায় অভিমত ব্যক্ত করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং কওমি মাদরাসা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে সভায় বলা হয়, কোনো সংবাদ, ভিডিও, বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ বা প্রচার করা উচিত নয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানানো হয়।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত অভিযোগ, তথ্য-উপাত্ত, ফ্যাক্ট-চেকিং ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র গ্রহণের জন্য ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ নম্বরে (হোয়াটসঅ্যাপ) একটি বিশেষ হটলাইন চালু করা হয়েছে। এই নম্বরে মেসেজ, ভয়েস কল, ছবি, ভিডিও এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট পাঠানো যাবে।
এছাড়া আল-হাইআতুল উলয়ার অধীন ছয়টি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড তাদের অধিভুক্ত মাদরাসাগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য পৃথক ‘মাদরাসা মনিটরিং সেল’ গঠন করবে এবং মাদরাসা পরিদর্শন ও মনিটরিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
সভায় কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি ‘লিগ্যাল প্যানেল’ গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’-এর সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন আল্লামা শেখ সাজিদুর রহমান, মাওলানা মুফতি রুহুল আমীন, মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, মাওলানা আব্দুল বছীর, মাওলানা মুফতি এনামুল হক, মাওলানা একরাম হোসাইন ওয়াদুদী, মাওলানা মুহসিন শরীফ এবং মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আলী।
সভায় উপস্থিত প্রতিনিধিরা কওমি মাদরাসার শিক্ষার মান, নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা, জবাবদিহিতা ও নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, তদারকি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি যে কোনো অপরাধ, অনিয়ম ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল ও কঠোর অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি মিথ্যা অপবাদ, মিডিয়া ট্রায়াল এবং চক্রান্তের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, মুহতামিম ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
আইও/